যশোরের শার্শায় ২৩টি ইটভাটার মধ্যে ২০টি ভাটা কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমি দখল, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও ভয়াবহ বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে অবৈধ ইটভাটা। হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও উপজেলার একাধিক ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে। এতে একদিকে যেমন আইনের শাসন উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও জনবসতি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বের (সাধারণত তিন কিলোমিটার) মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। একইসাথে কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন, কাঠ বা জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব শর্ত লঙ্ঘনকারী ইটভাটা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১২ মার্চ হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিটের ভিত্তিতে গঠিত পরিদর্শন কমিটি শার্শা উপজেলার ২৩টি ইটভাটা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য, ২৩টির মধ্যে ২০টি ইটভাটাই কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইট পোড়ানো ও কাঁচা ইট তৈরিসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট ভাটা মালিকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করেন।
তবে প্রশাসনিক নির্দেশনার পরও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লক্ষণপুর ইউনিয়নের সবুজ হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স কে এ এ ব্রিকস, বাগআঁচড়া ইউনিয়নের টেংরা জামতলার সিরাজুল ইসলামের মেসার্স রিফা ব্রিকস, একই এলাকার তৌহিদুর রহমানের মেসার্স বিশ্বাস ব্রিকস, কুচেমোড়া হাড়িখালির মিজানুর রহমানের টাটা ব্রিকস, গোগা ইউনিয়নের হযরত আলীর মেসার্স রাজ ব্রিকস, ইছাপুর এলাকার শফিউর রহমানের মেসার্স এস টি ব্রিকস, কায়বা ইউনিয়নের পশ্চিমকোটার হাজরাতলা এলাকার আরফাত ইসলামের মেসার্স নাইস ব্রিকস, পিঁপড়াগাছীর শহিদুল ইসলামের মেসার্স সাফা ব্রিকসসহ প্রায় ২০টি ইটভাটা এখনো প্রকাশ্যে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, শার্শা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবিরের মালিকানাধীন মেসার্স প্রাইম ব্রিকস লাইসেন্স নবায়ন না থাকায় চলতি মৌসুমে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া আর্থিক সঙ্কট ও লাইসেন্স জটিলতার কারণে আরো তিনটি ইটভাটা বর্তমানে বন্ধ আছে বলে জানা গেছে।
ভাটা মালিকদের দাবি, অতীতে সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই ‘হাওয়া ভাটা’ ও ‘ঝিকঝাক ভাটা’ পদ্ধতিতে লাইসেন্স গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নতুন লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে।
তাদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় সাত থেকে ১০ হাজার ইটভাটা চালু রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অবৈধ। এসব ইটভাটার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা জড়িত। লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দিলে তারা পরিবেশ আইন ও শ্রম আইন মেনেই ইটভাটা পরিচালনা করবেন বলে দাবি করেন মালিকরা।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনের শিথিলতা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা দ্রুত উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবির বলেন, ‘একসময় সরকারি নিয়ম মেনেই আমরা লাইসেন্স নিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক ভাটা সঙ্কটে পড়েছে। নবায়নের সুযোগ পেলে আমরা পরিবেশ ও শ্রম আইন মেনেই ভাটা পরিচালনা করতে প্রস্তুত।’
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। আদালতের নির্দেশ অমান্যকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



