ভোলার গজারিয়া পশুর হাট, আড়াইশ বছর খাজনামুক্ত বেচাকেনা

হাটে গরু কিনতে আসা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, গজারিয়া হাটে ছোট বড় সব ধরনের গরু পাওয়া যায়। বিশেষ করে চরের দেশী প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা গরুগুলো দেখতে ভালো লাগে দামও সাধ্যের মধ্যে। কোনো ধরনের ঝামেলা নাই।

ভোলা প্রতিনিধি

Location :

Bhola
ঐতিহ্যের গজারিয়া হাটে উপচে পড়া ভিড়
ঐতিহ্যের গজারিয়া হাটে উপচে পড়া ভিড় |নয়া দিগন্ত

ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে ভোলার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে দেড় শতাধিক পশুর হাট। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন হাটে বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।

তবে এসব হাটের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার গজারিয়া পশুর হাট। যা স্থানীয়দের কাছে ‘মিয়া বাড়ির দরজার হাট’ নামে বেশি পরিচিত। প্রায় আড়াই শ’ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী হাটে সপ্তাহে তিনদিন পশুর হাট বসে। প্রতিটি হাটে কয়েক কোটি টাকার গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচা হয়।

এই হাটের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানে ক্রেতা কিংবা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল, খাজনা বা চাঁদা নেয়া হয় না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কেনাবেচা করতে পারেন।

খোলা পরিবেশ, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, নিরাপদ বেচাকেনা এবং অতিরিক্ত খরচ না থাকায় গজারিয়া পশুর হাট এখন ভোলাসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, আর প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠছে ঐতিহ্যের এই পশুর হাট। প্রতি হাটে কয়েক কোটি টাকার গরু-ছাগল বিক্রি হয়।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ভোলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত গজারিয়া বাজার সংলগ্ন বালিয়া মিঞা বাড়ির সামনের খোলা মাঠে বসে এ পশুর হাট। জেলার শতবর্ষের পশুর হাটের মধ্যে এটি অনেক বড় হাট।

দালাল ও খাজনামুক্ত হওয়ায় জেলার চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান চরপাতা ও ভোলা সদরের ভেলুমিয়া, আলীনগর, চরসামাইয়া, বাঘমারা, রাজাপুর, চর চন্দ্রপ্রসাদ, এলাকা থেকে নানা প্রজাতের কোরবানির দেশী গরু, ছাগল বাজার সয়লাব হয়ে যায়। এখানে ছোট, বড়, মাঝারি তথা সব ধরনের পশু পাওয়া যায় বলে মাঠ ভর্তি উপচেপড়া ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠে কোরবানির হাট। হাট ছাড়িয়ে রাস্তাঘাটসহ আশপাশের এলাকাগুলোও পূর্ণ হয়ে যায় পশুতে। তাই হাটের আগের দিন বিক্রেতারা মাঠে খুঁটি পুঁতে জায়গা নির্ধারণ করে।

দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা ও ব্যাপারীরাও পছন্দের পশুটি কিনতে এ হাটে আসে। বাজারের দরের সাথে সঙ্গতি রেখেই পছন্দের পশুটি ক্রয় করতে পারেন ক্রেতারা। তাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। ঈদের আগেভাগে ক্রয়কৃত পশু বাড়িতে পৌঁছে দিতেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

এই হাটে গরু নিয়ে আসা লোকমান হোসেন বলেন, গজারিয়া বাজার ভোলার ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশুর হাট। মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর পূর্বপুরুষরা এই হাট খাজনা ফ্রি করে দিয়ে গেছে তাই আমরা এই হাটে গরু নিয়ে আসি। আমরা গরু বিক্রিতারা এই বাজারে গরু বিক্রি করতে পারলে আমাদের খাজনা কিংবা চাঁদ দেয়া লাগে না। বিক্রি করে পরিপূর্ণ অর্থটাই পাই। কোনো দালাল নাই।

ভেলুমিয়া থেকে গরু নিয়ে আসা রমিজল ব্যাপারী বলেন, এই হাটে সপ্তাহে শনি, সোম ও বুধবারে হাট বসে। কোনো চাঁদবাজী নাই খাজনা নাই।

খামারি মাহফুজ জানান, গজারিয়া এই হাটে আশপাশের ইউনিয়ন ও চরের গরু উঠে। তাই দেশী গরু হওয়ায় ক্রেতারা এখান থেকে কিনে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। এছাড়াও আমরা অন্য হাটে একটা গরু বিক্রি করলে লাখে ৫ হাজার টাকার মতো খাজনা দেয়া লাগে। এখানে সম্পূর্ণ খাজনা ফ্রী। তাই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় কেনা-বেচা করে খুশি।

বিক্রেতা আলমগীর ব্যাপারী জানান, খাজনা নাই, গরু বেচা-কেনা ভালো হয়। এই পশুর হাট অনেক পুরাতন। মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জু মিঞার বাপ-দাদারা এই হাটকে খাজনামুক্ত কোরবানির হাট করেন।

ক্রেতা সোয়েব জানান, আমরা প্রতি বছর এ হাট থেকেই গরু ক্রয় করি। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর দাম বেশি। তবে দাম বেশি হলেও পছন্দেরটা কিনতে পেরেছি।

হাটে গরু কিনতে আসা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, গজারিয়া হাটে ছোট বড় সব ধরনের গরু পাওয়া যায়। বিশেষ করে চরের দেশী প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা গরুগুলো দেখতে ভালো লাগে দামও সাধ্যের মধ্যে। কোনো ধরনের ঝামেলা নাই।

মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর চাচাতো ভাই জামাল মিয়া বলেন, প্রায় আড়াই শ’ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ আরব আলী মিঞা কোরবানির পশু কিনতে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলাবাজার খাষেরহাট নামক পশুর হাটে যান। তার পছন্দের পশু কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তিনি পশু কেনার খাজনার বিড়ম্বনায় পড়েন। খাজনা আদায়কারী তার কাছে খাজনার টাকা দাবি করায় বিষয়টি তার আত্মসম্মানে আঘাত করে। খাজনার বিড়ম্বনার শিকার হয়ে তাদের মিঞা বাড়ির সামনের বিশাল মাঠে খাজনামুক্ত পশুর হাট বসায়। সেই থেকেই সম্পূর্ণ খাজনামুক্ত জেলার অন্যতম কোরবানির পশুর হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।