ময়মনসিংহের নান্দাইলে ব্রিজের নিচ থেকে তিন বস্তা জবাই করা ঘোড়ার চামড়া, মাথা ও পা উদ্ধারের ঘটনায় গোশতের বাজারে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘোড়া জবাই করে গোশত অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গরুর গোশতের নামে বিক্রি করে আসছে একটি অসাধু চক্র। তবে অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের তদন্ত জরুরি।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভোরে উপজেলার চর বেতাগৈর ইউনিয়নের চর লক্ষিদিয়া ব্রিজের নিচে বস্তাগুলো পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে বস্তা খুলে জবাই করা ঘোড়ার চামড়া, মাথা ও পা দেখতে পাওয়া যায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় জমে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘোড়াগুলো কোনো একটি স্থানে জবাই করে গোশত অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় ঘোড়ার গোশত গরুর গোশতের সাথে মিশিয়ে বিক্রির গুঞ্জন থাকলেও এতদিন তা প্রমাণ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এবার ব্রিজের নিচে একসাথে তিন বস্তা ঘোড়ার দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় সেই অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নান্দাইলের কানুরামপুর, চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড, ঈশ্বরগঞ্জের মাইজবাগ ও মধুপুর বাজারের কয়েকটি গোশতের দোকানে দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়ার গোশত সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন অসাধু কসাই ও ব্যবসায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদারকিতে নেই প্রাণিসম্পদ বিভাগ, দায় ঠেলাঠেলি
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে গোশতের বাজারে সরকারি তদারকি নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নান্দাইল ও ঈশ্বরগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে পশু জবাই ও গোশত বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মনিটরিং নেই। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ ক্রেতাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিচ্ছে।
সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জবাই-পরবর্তী গোশত পরীক্ষা-নিরীক্ষা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মাঠপর্যায়ে এ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে রোগাক্রান্ত বা অনুপযুক্ত পশুর গোশত বাজারে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: কে এম আব্দুল আল মামুন জানান, তাদের লোকবলের সঙ্কট রয়েছে। তাছাড়া নির্দিষ্ট জবাইখানা না থাকায় কখন, কোথায় পশু জবাই হচ্ছে, তার তথ্য তাদের কাছে থাকে না। ফলে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তার দাবি, এসব কাজ স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের করার কথা।
অন্যদিকে নান্দাইল উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মিজানুর রহমান বলেন, ২০১১ সালের নীতিমালা অনুযায়ী এ কাজ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের। তারা কেন দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন, তা তার বোধগম্য নয়।
দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে পাল্টাপাল্টি অবস্থান। আর এই দায় ঠেলাঠেলির মাঝেই প্রশ্ন উঠছে— তাহলে বাজারে বিক্রি হওয়া গোশতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
ভোক্তাদের আতঙ্ক, তদন্তের দাবি
ঘোড়ার দেহাবশেষ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নান্দাইলসহ আশপাশের এলাকার গোশতের বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভোক্তাদের প্রশ্ন, গরুর গোশতের নামে অন্য কোনো পশুর গোশত বিক্রি হচ্ছে কি-না, তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
স্থানীয়দের দাবি, উদ্ধার হওয়া চামড়া, মাথা ও পায়ের নমুনা পরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক। একইসাথে ঘোড়া জবাইয়ের সাথে কারা জড়িত, কোথায় গোশত সরবরাহ করা হয়েছে এবং কোন কোন দোকানে তা বিক্রি হয়েছে— তা খুঁজে বের করতে দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কসাই বা বিক্রেতা নয়, এই চক্রের নেপথ্যের মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বাজারগুলোতে নিয়মিত অভিযান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ প্রদর্শন এবং গোশতের উৎস নিশ্চিত করার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্রিজের নিচে তিন বস্তা ঘোড়ার দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কি-না— নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি সঙ্ঘবদ্ধ গোশত বাণিজ্য চক্র, এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



