২৬ বছর ধরে শিকল বন্দি মুক্তারুল, অর্থাভাবে থমকে আছে চিকিৎসা

প্রায় ২৬ বছর আগে বিয়ের পর হঠাৎ তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্থানীয় মানুষের সাথে অকারণে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তেন।

Location :

Thakurgaon
শিকল বন্দি মুক্তারুল
শিকল বন্দি মুক্তারুল |নয়া দিগন্ত

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা
গাছের সাথে বাঁধা শিকল, সেই শিকলের এক প্রান্তে ২৬ বছর ধরে বন্দি এক মানুষ। বয়স বাড়ছে, শরীরও বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি তার জীবন। মুক্ত বাতাসে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার সুযোগ নেই, নেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তাও। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের মুক্তারুল ইসলামকে বছরের পর বছর এভাবেই শিকলে বেঁধে রাখতে হচ্ছে পরিবারকে।

পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা ইউনিয়নের ভবানীপুর সল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুক্তারুল ইসলাম।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৬ বছর আগে বিয়ের পর হঠাৎ তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্থানীয় মানুষের সাথে অকারণে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তেন। কখনো কখনো মানুষকে মারধর এবং ফসলের ক্ষতি করার ঘটনাও ঘটত বলে পরিবারের দাবি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকটা বাধ্য হয়েই পরিবারের সদস্যরা তাকে ২৬ বছর ধরে গাছের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। মাঝে মধ্যে শিকল খুলে দেয়া হলেও অধিকাংশ সময়ই তাকে শিকলে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়।

পরিবারের ভাষ্য, শিকল খুলে দিলে তিনি নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতি করতে পারেন এমন আশঙ্কায় তাকে বাইরে যেতে দেয়া হয় না।

মুক্তারুলের স্ত্রী নাসেরা বেগম একজন দিনমজুর। এক সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। স্বামীর চিকিৎসা তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই তাকে সংগ্রাম করতে হয়। অন্যের বাড়িতে কাজ এবং দিনমজুরি করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালান তিনি।

স্বামীর দেখাশোনা, খাবার ও প্রয়োজনীয় যত্নের পাশাপাশি একমাত্র সন্তানকে পড়ালেখা করানোর চেষ্টাও করছেন নাসেরা। কিন্তু স্বামীর চিকিৎসার কথা উঠলেই যেন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

কথা বলতে গিয়ে কষ্টে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাসেরা বেগম তিনি বলেন, ‘সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়, দিনমজুরিও করি। স্বামীর যত্ন নিতে হয়, তার খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয়। যা আয় করি, তাতেই সংসার চলে না। অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে পড়ালেখা করাচ্ছি। স্বামীর চিকিৎসা করানোর মতো টাকা বা সামর্থ্য আমার নেই।’

২৬ বছরের বন্দিজীবনের অবসান চান মুক্তারুলের পরিবার একসময় যে মানুষটি পরিবারের সাথে স্বাভাবিক ভাবে জীবন কাটাতেন, আজ তার দিন কাটছে শিকলের বাঁধনে। ২৬ বছর ধরে এভাবেই কেটে গেছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। তার স্ত্রীও বয়সের ভারে ক্লান্ত তবুও স্বামীকে ফেলে যেতে পারেননি। নিজের কষ্টের সাথে লড়াই করে প্রতিদিন স্বামীর দেখাশোনা করে যাচ্ছেন। সু-চিকিৎসা পেলে সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়ার আশার কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের সদস্যদের দাবি, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ১১ নম্বর বৈরচুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিমু সরকার বলেন, ‘মুক্তারুল দীর্ঘদিন ধরে শিকলে বন্দি। চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসার জন্য অর্থের প্রয়োজন। তার পরিবারের সেই সামর্থ্য নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করেছি। এখন তার চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।’