বদলগাছী (নওগাঁ) সংবাদদাতা
দুই চোখে আলো নেই। অথচ কণ্ঠে তার অপার প্রাণের স্পন্দন। হাতে কখনো খঞ্জনি, কখনো আলুর পাপড়ের প্যাকেট। রাস্তার মোড়, হাট-বাজার, চায়ের দোকান কিংবা রেলস্টেশন—যেখানেই মানুষের সমাগম, সেখানেই শোনা যায় তার মায়াবী কণ্ঠের গান। গান শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়, আর সেই গানের টানে কেউ কেউ কিনে নেন তার আলুর পাপড়, বাদাম কিংবা চিপস। এভাবেই গান আর ক্ষুদ্র ব্যবসাকে অবলম্বন করে ঘুরছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মজিদুলের জীবনের চাকা।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চাংলা গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলীর ছেলে মজিদুলের বয়স ৩৮ বছর। জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন এই যুবকের জীবন কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। অভাবের সংসারে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। মক্তবে কিছুদিন আরবি শিক্ষা নিয়েছেন। এরপর সংসারের অভাব, নিজের প্রতিবন্ধকতা আর জীবনধারণের কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই শুরু হয় তার।
একসময় ভিক্ষা করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন মজিদুল। কিন্তু অন্যের কাছে হাত পেতে চলার বিষয়টি তার মনে স্বস্তি দিত না। নিজের পরিশ্রমে কিছু করার তাগিদ থেকেই শুরু হয় নতুন পথের সন্ধান।
গানই হয়ে উঠল জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার
ছোটবেলায় গ্রামে জারি-সারি, কিচ্ছা-পালা ও বিভিন্ন গানের আসরে বাবা কিংবা দাদার সাথে যেতেন মজিদুল। চোখে দেখতে না পেলেও গান শুনে তার মন ভরে যেত। সেই ভালো লাগা থেকেই একদিন নিজেই গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
ভাবনা থেকেই শুরু হয় পথচলা। হাতে উঠে আসে খঞ্জনি, আর সাথে মায়াভরা কণ্ঠ। পথে পথে গান গেয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করতে থাকেন তিনি। তার গান শুনে কেউ খুশি হয়ে কিছু টাকা দিতেন, কেউ আবার কিনে নিতেন তার সাথে থাকা পণ্য। এভাবেই ধীরে ধীরে গান হয়ে ওঠে তার জীবিকা, আর জীবনের কঠিন লড়াইয়ে গানই হয়ে ওঠে তার অন্যতম হাতিয়ার।
‘ভবে কেউ কারো নয়’, ‘দুখের দুঃখী আল্লাহ বলো’, ‘মনরে পাখি একবার মওলা বলো’, ‘হইলো না হইলো নামাজ আমার’, ‘তুমি আমার আমি তোমার’, ‘স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসে শুধু আমার মা’—এমন নানা আধুনিক, পল্লীগীতি, বিচ্ছেদ, মুর্শিদী ও আধ্যাত্মিক গান তার কণ্ঠে শুনতে পাওয়া যায়।
ভাদ্রের তপ্ত দুপুর। প্রচণ্ড গরমে যখন জনজীবন প্রায় অতিষ্ঠ, তখন বদলগাছী থানা মোড়ের একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা মানুষগুলোর আড্ডায় হঠাৎ ভেসে আসে পুরোনো বাংলা গানের সুর। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো কোথাও রেকর্ড বাজছে। পরে দেখা গেল, পথ ধরে গাইতে গাইতে সেখানে এসে বসেছেন মজিদুল।
খালি গলায় হারানো দিনের গান গাইছিলেন তিনি। গান থামিয়ে সহজ-সরল কণ্ঠে বললেন, ‘আমার গান শুনে কারো ভালো লাগলে আমার কাছ থেকে আলুর পাপড় কিনবেন। তাতেই আমি খুশি।’
তার এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
গান শুনিয়ে, পাপড় বিক্রি করেই সংসার
মজিদুল জানান, একসময় শুধু গান গেয়েই প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। সেই টাকা দিয়ে নিজের পাশাপাশি ছোট দুই ভাই রাজিব ও আসলামের পড়াশোনার খরচও চালিয়েছেন। তবে সময়ের সাথে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন শুধু গান গেয়ে আয় করার ওপর নির্ভর না করে গান গাওয়ার পাশাপাশি বাদাম, আলুর পাপড় ও চিপস বিক্রি করেন তিনি।
মজিদুলের ভাষায়, ‘অতি দরিদ্র পরিবারে আমার জন্ম। পিতার অভাবের সংসারের হাল ধরতেই এবং জীবন-জীবিকার তাগিদে গান গেয়ে অর্থ উপার্জনের পেশায় এসেছি। এখন মানুষ আমার গান শুনে খুশি হয়ে আমার কাছ থেকে বাদাম, আলুর পাপড় ও চিপস কিনে। এভাবেই আমার সংসার চলে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তার ব্যবসায় পুঁজি খুবই কম। অল্প পুঁজিতে তেমন লাভও হয় না। কোনো বিত্তবান ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে ব্যবসাটি আরো ভালোভাবে করতে পারতেন।’
পরিবারও নির্ভরশীল তার ওপর
মজিদুল অবিবাহিত। কৃষিকাজ করে বাবা ইদ্রিস আলী অতিকষ্টে সংসার চালান। মা-বাবার পাশাপাশি ছোট দুই ভাইকে নিয়েই তাদের পরিবার। পরিবারের অভাবের কারণে একসময় ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনাও প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন মজিদুলের উপার্জনই পরিবারের অন্যতম ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করে জীবনের পথে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
বদলগাছী থেকে জয়পুরহাট—গানের পথচলা
শুধু বদলগাছী নয়, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর, নজিপুর, সাপাহার, মান্দা ও নওগাঁ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গান গেয়ে বেড়ান মজিদুল। পাশের জেলা জয়পুরহাটের আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশনেও তাকে ঘুরে ঘুরে গান গাইতে দেখা যায়।
যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই তার গানের আসর। গান শুনে মানুষ দাঁড়ায়, কেউ মুগ্ধ হয়, কেউ পাপড়-বাদাম কিনে নেয়। আর এভাবেই মানুষের ভালোবাসা আর নিজের শ্রমকে পুঁজি করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বদলগাছী থানা মোড়ের চায়ের দোকানদার বিদ্যুৎ বলেন, ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মজিদুল সামান্য প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এই অল্প টাকা দিয়ে তার সংসার চালানো কঠিন। তাই বাধ্য হয়ে পথে পথে ঘুরে গান গেয়ে মানুষের মনে আনন্দ দেন। তার গান শুনে খুশি হয়ে শ্রোতারা তার কাছ থেকে বাদাম ও পাপড় কেনেন। সেই অর্থেই চলে তার সংসার।’
বদলগাছী থানা মোড়ের দোকানদার রকি বলেন, ‘মজিদুল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও অত্যন্ত পরিশ্রমী। গান গাওয়ার পাশাপাশি বাদাম, আলুর পাপড় ও চিপস বিক্রি করে জীবন-জীবিকা চালায়।’
একটু সহযোগিতা বদলে দিতে পারে জীবন
মজিদুলের গল্প শুধু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের গল্প নয়; এটি আত্মসম্মান, শ্রম আর স্বনির্ভরতার গল্প। একসময় ভিক্ষার ঝুলি হাতে পথ চলা মানুষটি আজ নিজের শ্রমে পণ্য বিক্রি করছেন। গানকে সঙ্গী করে মানুষের মন ভালো করছেন, আর সেই মানুষগুলোর কাছেই নিজের পণ্য বিক্রি করে উপার্জন করছেন।
তবে অল্প পুঁজির কারণে তার এই ছোট ব্যবসার পরিধি বাড়ছে না। সামান্য সহযোগিতা পেলে তিনি আরো বেশি পণ্য কিনে ব্যবসা বড় করতে পারবেন। তাতে হয়তো অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারবেন নিজের পায়ে।
চোখে আলো নেই মজিদুলের। কিন্তু জীবনের প্রতি তার যে অদম্য প্রত্যয়, তাতে যেন আলোর কোনো অভাব নেই। খঞ্জনির তালে তালে তার কণ্ঠে যখন গান বেজে ওঠে, তখন সেই গান শুধু পথচারীদের বিনোদন দেয় না—শোনায় বেঁচে থাকার সাহসের গল্প।
গানের সুরে আলুর পাপড় বিক্রি করে চলা মজিদুল তাই আজ বদলগাছীর পথে পথে এক জীবন্ত উদাহরণ—শরীরের সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামাতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে থামাতে পারে না।



