খেজুর গাছে রসের হাড়ি না থাকলেও গুড়ে ভরা বোয়ালমারীর হাট-বাজার

এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই বাজারে বাড়ছে নকল ও ভেজাল গুড়ের দৌরাত্ম্য। বোয়ালমারীর বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে- পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকলেও বাজারে গুড়ের সরবরাহ কমছে না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র কেমিক্যাল ব্যবহার করে নকল গুড় তৈরি করে তা খেজুর গুড় নামে বিক্রি করছে।

Location :

Boalmari
খেজুরের গুড় বলে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল গুড়
খেজুরের গুড় বলে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল গুড় |ছবি : নয়া দিগন্ত

ইকবাল হোসেন লিমন, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
শীতের ভোরে বোয়ালমারীর গ্রামবাংলায় এখন আর আগের মতো খেজুর গাছে ঝুলতে দেখা যায় না রসের হাঁড়ি। কুয়াশাভেজা সকালে গাছিদের রস নামানোর দৃশ্যও ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, রস না থাকলেও বোয়ালমারীর বিভিন্ন হাট ও বাজারে গুড়ের কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে সারি সারি দোকানে খেজুর গুড় বিক্রি হচ্ছে, দামও আকাশচুম্বী, কিন্তু সেই গুড় কতটা খাঁটি তা নিয়ে ক্রেতাদের মনে বাড়ছে সন্দেহ।

ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলা খেজুর গুড় উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত ছিল। শীত এলেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে-মাঠে খেজুর গাছ কাটা হতো, রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হতো স্বাদে-গন্ধে অনন্য খেজুর গুড়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই গুড় যেত জেলার বাইরেও। এই ঐতিহ্য আজও মানুষের মুখে মুখে থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন অনেকটাই কমে গেছে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে গাছির অভাব। যেসব গাছ এখনো আছে, সেগুলো কাটার মতো দক্ষ গাছি পাওয়া যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, কম আয় আর পেশাগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রজন্ম গাছি পেশায় আসছে না। ফলে পর্যাপ্ত রস সংগ্রহ না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে খেজুর গুড় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই বাজারে বাড়ছে নকল ও ভেজাল গুড়ের দৌরাত্ম্য। বোয়ালমারীর বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে- পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকলেও বাজারে গুড়ের সরবরাহ কমছে না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র কেমিক্যাল ব্যবহার করে নকল গুড় তৈরি করে তা খেজুর গুড় নামে বিক্রি করছে।

ক্রেতারা বলছেন, বর্তমানে হাজার টাকা কেজি দামেও আসল খেজুর গুড় পাওয়া কঠিন। অনেক বিক্রেতা নিজেদের গুড় খাঁটি বলে বিক্রি করলেও ব্যবহার করার পর বোঝা যায় স্বাদ ও গন্ধে স্বাভাবিক খেজুর গুড়ের সাথে তার মিল নেই। বোয়ালমারী বাজারে আসা এক ক্রেতা সাইদুর শামিম জানান, গুড়ে কৃত্রিম ঘ্রাণ থাকে, যা থেকে ভেজালের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আরেক ক্রেতা নাজমা সুলতানা বলেন, রঙ ও ঘনত্ব দেখে কিনলেও পরে বুঝতে পারি এতে কেমিক্যালের প্রভাব আছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভেজাল আড়াল করতে কেমিক্যালযুক্ত ফ্লেভার বা ফ্র্যাগরেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে গুড়ে, যাতে তা দেখতে ও গন্ধে আকর্ষণীয় মনে হয়। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে অনেক ব্যবসায়ী দাবি করেন, তারা নিজেরা গুড় তৈরি করেন না। তারা গাছিদের কাছ থেকেই গুড় কিনে এনে বাজারে বিক্রি করেন। ভেজালের বিষয়ে তারা অবগত নন বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলভীর রহমান বলেন, গাছি সঙ্কটের কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ খেজুর গুড় উৎপাদন হচ্ছে না। এই সুযোগে নকল ও ভেজাল গুড় বাজারে ঢুকে পড়ছে। খাঁটি গুড় নিশ্চিত করতে হলে গাছি পেশায় উৎসাহ বাড়ানো এবং ভেজাল রোধে নজরদারি জোরদার করা জরুরি।