সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও অস্বাভাবিক জোয়ারের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। আগ্রাসী ঢেউয়ের লাগাতার আঘাতে বিলীন হয়ে গেছে সৈকতের বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি। উপড়ে পড়েছে শত শত ঝাউগাছ এবং সৈকতের পুলিশ বক্স, লকারসহ অনেক স্থাপনা।
বৈরী আবহাওয়ায় গত শুক্রবার থেকে রোববার (২৭ জুলাই) পর্যন্ত টানা এমন পরিস্থিতি বিরাজ করে।
সমুদ্র সৈকতের বিচকর্মী ও লাইফগার্ড সদস্যরা জানায়, নিম্নচাপের প্রভাবে গত বৃহস্পতিবার থেকে সাগরের পানি বৃদ্ধি পায়। শুক্রবার থেকে সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ আঘাত হানে তীরে। ফলে সমুদ্র সৈকতের লাবণী, শৈবাল, ডায়বেটিক পয়েন্টের বালিয়াড়িতে ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
সি-সেইফ লাইফ গার্ডের দলনেতা মোহাম্মদ ওসমান গণি জানান, ‘ঢেউয়ের তীব্র আঘাতে লাবণী থেকে ডায়বেটিক পয়েন্ট পর্যন্ত তীব্র ভাঙন ধরেছে। তিন দিন ধরে জোয়ারের সময় এ ভাঙন অব্যাহত থাকে। শৈবাল থেকে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয় পর্যন্ত বালিয়াড়ির ৫-১০ গজ পর্যন্ত সাগরে বিলীন হয়েছে। এতে হাজারোধিক ঝাউগাছ উপড়ে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। একইসাথে লাবণী পয়েন্টে পুলিশ বক্স ও লকার, একটি ওয়াচ টাওয়ার সৈকত পাড় ভেঙে সাগরগর্ভে তলিয়ে গেছে।’
গত তিন দিন ধরে জোয়ারের সময় এমন লণ্ডভণ্ড পরিস্থিতি বিরাজ করে। এছাড়া ভাঙনের উপক্রম হয়েছে একটি রেস্তোঁরাও। এছাড়া শৈবাল পয়েন্টে দুইটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর ঝাউগাছ ভেঙে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে ওই গাছ কেটে সরিয়ে নেয়া হলেও ঝুঁকিতে রয়েছে আরো বেশ কিছু খুঁটি।
এদিকে এমন ভাঙন অব্যাহত থাকলে সৈকত ঘেঁষে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয়, জেলা প্রশাসনের তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রসহ আরো কিছু স্থাপনা অচিরেই সাগরগর্ভে হারানোর হুমকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগ জানিয়েছে, সাগরের আগ্রাসনে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে পড়েছে ঝাউবাগান। গত ১০ বছর ধরে সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজারো ঝাউগাছ। নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সব জায়গার ঝাউগাছই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তবে চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ ঝাউগাছ বিলীন হয়েছে।
কক্সবাজার সদর রেঞ্জের নাজিরারটেক থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত ১৯৬১-৬২ সালে ১২ হেক্টর বালিয়াড়িতে প্রথমে সৃজন করা হয় ঝাউগাছ। ১৯৭৪ সালে ঝাউ বাগানের প্রসার ঘটানো হয়। তখন থেকেই এ ঝাউবাগান সমুদ্র পাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করে আসছে। তবে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে অর্ধেকের বেশি বাগান বিলীন হয়ে যায়।
সূত্র আরো জানায়, ১৯৯১-৯২ সালে ১২ হেক্টর বালিয়াড়িতে নতুন করে প্রায় ৩০ হাজার চারা রোপণ করা হয়। ১৯৯৬-৯৭ সালে ১১৫ হেক্টর বালিয়াড়িতে রোপণ করা হয় ৩ লক্ষাধিক ঝাউচারা। পরে ১৯৯৭-৯৮ সালে ৪০ হেক্টরে লক্ষাধিক চারা, ১৯৯৮-৯৯ সালে ৫ হেক্টরে সাড়ে ১২ হাজার চারা, ২০০২-০৩ সালে ৮ হেক্টরে ২০ হাজার চারা, ২০০৩-০৪ সালে ৮৭ হেক্টরে ২ লাখ ১৭ হাজার চারা ও ২০১০-১১ সালে ৫ হেক্টরে সাড়ে ১২ হাজার চারা রোপণ করা হয়। প্রতি হেক্টরে আড়াই হাজার করে প্রায় ৩০০ হেক্টরে সাড়ে ৭ লক্ষাধিক ঝাউগাছ সৃজন করা হয়।
এ বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো: নূরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জোয়ারে ঢেউয়ের ধাক্কায় ভাঙতে থাকে সৈকতের বালিয়াড়ি। জোয়ারের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় ঝাউগাছের গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঝাউবাগান। যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা অন্য কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূল রক্ষায় সাগর তীরে আধুনিক পদ্ধতিতে কোনো বাঁধ নির্মাণ করা যেত তাহলে ঝাউগাছ রক্ষা পেত।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ সংকটাপন্ন এ এলাকায় প্রতিবছর জিও ব্যাগ বসিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্থায়ী সুরক্ষার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই প্রকল্প পাস হলে আশা করি এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে।’



