বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জনের মৃত্যু

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা, পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ হওয়ার পর প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা

Location :

Sreemangal
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ সীতেশ রঞ্জন দেব
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ সীতেশ রঞ্জন দেব |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও দেশের বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ সীতেশ রঞ্জন দেব আর নেই। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

তার মৃত্যুর খবরে শ্রীমঙ্গলজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে শত শত মানুষ তার বাসভবনে ভিড় করেন। পরে তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে লাশ নেয়া হলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সদর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের পারিবারিক শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এছাড়া পরিবেশবাদী, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও তার ছেলে স্বপন দেব সজল জানান, কয়েক দিন ধরে সীতেশ রঞ্জন দেব শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তার অবস্থার অবনতি হলে শ্রীমঙ্গল পলিক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা, পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ হওয়ার পর প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পরিবেশবিদদের মতে, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সীতেশ রঞ্জন দেবের অসামান্য অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার মৃত্যু দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ফাউন্ডেশনে তার লাশ নেয়া হলে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আহত ও অসহায় বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিষ্ঠাতাকে শেষ বিদায় জানাতে এসে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এ সময় শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহিবউল্লাহ আকন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু শহীদ আব্দুল্লাহ, চিকিৎসক ডা. হরিপদ রায়, ব্যবসায়ী নেতা দেবাশীষ ধর পার্থ, সমাজসেবক আব্দুর রহিম নোমানী, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রেমসাগর হাজরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা সীতেশ রঞ্জন দেব সবার কাছে ‘সীতেশবাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন। জীবনের শুরুতে তিনি একজন দক্ষ শিকারি ছিলেন। একসময় শিকারে গিয়ে বন্য ভাল্লুকের আক্রমণে একটি চোখ হারানোর পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এরপর শিকার ছেড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে আহত ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের কাজ পরিচালনা করেছেন। তার গড়ে তোলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ও ক্ষুদ্র চিড়িয়াখানা দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীদের কাছেও শ্রীমঙ্গলের অন্যতম পরিচিত আকর্ষণ।