পাইকগাছা (খুলনা) সংবাদদাতা
পাইকগাছার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কপিলমুনিকে ঘিরে কপোতাক্ষের উপর সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি গত ২৬ বছরেও। দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০০ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক শেষ হওয়ার পর কেটে গেছে আরোও দু’যুগ। এরপর ঠিকাদারী প্রতিষ্টানের আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে এক কোটি ৬৭ লাখ ৭২২ টাকা উত্তোলনের পর নদের নব্যতা হ্রাসের অযুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয় এর সামগ্রিক কার্যক্রম।
ব্রিজ নির্মাণকাজ শেষ করতে দু’পারের মানুষের গণদাবির প্রেক্ষিতে সেখানে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য এলজিইডির উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম প্রকল্প এলাকায় পরিদর্শন করেন। এসময় তারা সেখানে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিজাইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নীরিক্ষণ করেন। এরপর সেতুর বাস্তবায়নে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। এর পরও কেটে গেছে তিন বছর। এর মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন ও অন্তবর্তীকালীণ সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পর নির্বাচনে ফের বিএনপির সরকার গঠন। ইতোমধ্যে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ব্রিজের সম্ভাব্যতা নিয়ে ইতিবাচক জোর সুপারিশ করেছেন বলে জানানো হয়েছে। এরপর ফের আশায় বুক বেঁধেছেন অবহেলিত জনপদের দু’পারের মানুষ।
জানা গেছে, সেই ব্রিটিশ শাসনামলে আধুনিক কপিলমুনির রুপকার ও বিনোদগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু জনপদের উন্নয়নে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ তথা বাজার ব্যবস্থাপনায় কপিলমুনিতে গঞ্জ প্রতিষ্ঠা ও তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় কোলকাতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উত্তোরণে কপোতাক্ষের কপিলমুনিতে একটি সেতু বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেন। সে সময় নানা প্রতিবন্ধকতায় সেতু বাস্তবায়ন না হলেও সমপরিমাণ টাকা রেখে যান কোলকাতার ব্যাংকে।
এরপর ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ২০০০ সালে গুরুত্ব বিবেচনায় কপোতাক্ষের উপর কপিলমুনি সেতুর কার্যক্রম শুরু হলেও ২৬ বছরেও শেষ করা যায়নি এর কার্যক্রম।
তবে চলতি সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতির সোনালী সময়ে ফের উঠে এসেছে সেতু নির্মাণের বিষয়টি। সর্বশেষ এমপির ডিও লেটারে শুরু হয়েছে ফাইল চালাচালি। কপোতাক্ষের কপিলমুনি কেন্দ্রিক সেতুর বাস্তবায়ন হলে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে কপিলমুনির সাথে। বর্তমানে দু’টি রোড ক্রস করে ভোমরা থেকে কপিলমুনির দূরত্ব প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার। সেতুর বাস্তবায়নে কোনো ক্রসরোড ছাড়াই দুরত্ব কমে আসবে অর্ধেকে।
আর এতে করে সুন্দরবন উপকূলীয় দক্ষিণের অন্যতম প্রধান বানিজ্যিককেন্দ্র কপিলমুনি হয়ে উঠবে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক জোন হিসেবে। হাট ও বাজার ব্যবস্থাপনায় যোগ হবে নতুন নতুন এলাকা। যেখান থেকে এর সুবিধা পৌঁছে যাবে সাতক্ষীরার আশাশুনি, তালা, খুলনার পাইকগাছা, কয়রা, ডুমুরিয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা তথা সরাসরি খুলনার সাথে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিমায়িত চিংড়ি, কাঁকড়া, কুঁচের উৎপাদনস্থল সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট হলেও দীর্ঘ দিনেও এর কোনো নির্দিষ্ট জোন গড়ে ওঠেনি। সেতুটিকে কেন্দ্র করে জনপদের পারষ্পরিক স্বার্থ সুরক্ষায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় গড়ে উঠতে পারে লবণ পানির চিংড়ি জোন হিসেবে। এছাড়া অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের নায্য বাজার দাম থেকে বরাবরই বঞ্চিত হন এখানকার কৃষকরা। সেতুটির বাস্তবায়নে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগে ব্যবস্থা স্থাপন হলে বাজার ব্যবস্থাপনায়ও ঘটবে আমুল পরিবর্তন।
এছাড়া ভারত থেকে ভোমরা হয়ে সরাসরি আমদানি পণ্য যেমন পৌঁছে যাবে কপিলমুনিতে তেমনি রফতানি পণ্যও সরাসরি পৌছাবে ভারতে। আর সরাসরি আমদানি রফতানির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে নতুন মাত্রায় যুক্ত হবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সেতু নির্মাণে এর আগে সরকার এক কোটি ৯৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা বরাদ্দ করে। পরে কাজের মানোন্নয়নে বরাদ্দ বাড়িয়ে দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা করা হয়। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সেতুটির নির্মাণ কাজ পান আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অ্যাডভোকেট শেখ মো: নুরুল হকের মালিকানাধীন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এন হক এসোসিয়েট। প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালে সেতু নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করে আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে এক কোটি ৬৭ লাখ ৭২২ টাকা উত্তোলন করে এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।
বিষয়টি সেসময় আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা জটিলতায় বন্ধ থাকে সেতুর নির্মাণ কাজ। এমন পরিস্থিতিতে সেতুর বাকি নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে অপর একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিলেও সাতক্ষীরা পাউবোর ভ্রান্ত ধারণার উপর ভর করে বিশেষত, কপোতাক্ষ নদের স্রোতে বাঁধা পাওয়ায় নদের নব্যতা হ্রাসের আশংকার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক পত্রে এর সামগ্রিক নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
সেই থেকে গত ২৩ বছর বন্ধ রয়েছে এর নির্মাণ কাজ। এর আগে সেতুর এপ্রোচ সড়ক নির্মাণে দু’পারে জমি অধিগ্রহণ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে মাটি ভরাট করে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে পাউবোর আশংকায় সেতু নির্মাণকাজ বন্ধ হলেও নদের বুকে থেকে যায় সেতুর নির্মাণাধীন অন্তত দু’ডজন পিলার। যা পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায় নদীর জন্য। অতিদ্রুত এর নব্যতা হারিয়ে রীতিমত অস্তিত্ব সংকটে পড়ে খরস্রোতা কপোতাক্ষ। ২০১১ সালে কপোতাক্ষের নাব্যতা ফেরাতে সরকার প্রায় ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও নদীবক্ষ থেকে অপসারণ করা হয়নি পিলারগুলি।
স্থানীয়রা জানায়, কেবলমাত্র সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ও খেশরা ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাশের সাঁকো পার হয়েই আসে বিনোগঞ্জ (কপিলমুনি) কেন্দ্রীক ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে। বিশেষ করে উৎপাদিত ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় সাঁকোটি।
কপিলমুনি বিনোদ স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপঙ্কর সাহা জানান, আধুনিক কপিলমুনির স্থপতি রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু কপোতাক্ষের উপর সেতু নির্মাণে তৎকালীন কোলকাতা রিজার্ভ ব্যাংকে এক লক্ষরও বেশি পরিমাণ টাকা রেখে যান। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত সম্পর্কের অবনতির আগ পর্যন্ত বিনোদ বিহারী সাধু প্রতিষ্ঠিত কপিলমুনি সহচরী বিদ্যা মন্দির ও সিদ্ধেশ্বরী ব্যাংক প্রতি বছর ওই টাকার লভ্যাংশ হিসেবে অর্ধ লক্ষাধিক টাকা পেত। যা এখন বন্ধ রয়েছে। সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় খুলনা-৬ এর সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জানান, কপোতাক্ষের উপর কপিলমুনি-কানাইদিয়া সেতু নির্মাণ বাস্তায়নে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে একটি ডিও দিয়েছেন।
দীর্ঘ দিন ব্রিজটির বাস্তবায়নে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষায় কাজ করা সাংবাদিক এস এম মুস্তাফিজুর রহমান পারভেজ জানান, তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ ব্রিজটির বাস্তবায়নে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, কপোতাক্ষের উপর কপিলমুনি-কানাইদিয়া সেতু নির্মাণে প্রকৃত পক্ষে কোনো বাঁধা নেই। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর এলজিইডির সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি টিম প্রকল্পস্থল পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম নতুন করে শুরু হলেও এক অজ্ঞাত কারণে তা থমকে যায়। তিনি শুনেছেন বর্তমান সাংসদ ফের ডিও দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে।
ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কপিলমুনিতে কপোতাক্ষের উপর সেতু বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্তে অটুট ও জনপ্রতিনিধি তথা সরকারের সদিচ্ছাই পারে বিস্তীর্ণ জনপদের সর্বস্তরের মানুষের প্রতীক্ষার বাস্তবায়ন করতে।



