দৌলতদিয়ায় বাসডুবি : হাফেজা হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেলো আয়েশার

আয়েশার বাবা কোরআনের হাফেজ। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকেও হাফেজা বানাবেন। সেই লক্ষ্যে মাদরাসায় পড়াশোনা করছিল সে। গত রমজানে পরিবারের সাথে ওমরাহও করেছে।

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী

Location :

Rajbari
বড় চাচার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে ১৮ পারার হাফেজা আয়েশাকে
বড় চাচার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে ১৮ পারার হাফেজা আয়েশাকে |ছবি : নয়া দিগন্ত

চোখেমুখে ছিল পবিত্র কোরআনের হাফেজা হওয়ার স্বপ্ন। ১৮ পারা ইতোমধ্যে গেঁথে নিয়েছিলো হৃদয়ে। বাকি ছিল মাত্র ১২ পারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই পদ্মার বুকে হারিয়ে গেলো ১৩ বছরের কিশোরী আয়েশা বিনতে গিয়াস। বুধবার দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ঘটনায় পরিবারের আদরের আয়েশা এখন শায়িত আছে রাজরাড়ীর পার্শ্ববর্তী খোকসার পারিবারিক কবরস্থানে।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে জানাজা শেষে শমসপুর মোল্লাপাড়ার বাড়িতে আয়েশাকে দাফন করা হয়েছে।

ঘটনার দিন বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে বাসটি যখন দ্রুতগতিতে পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছিল, তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা গিয়াস উদ্দিন আর ভাই সাফিনের চোখের সামনেই মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে যায়। অলৌকিকভাবে মা লিটা খাতুন বেঁচে গেলেও, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তলিয়ে যায় আয়েশা।

আয়েশার বাবা কোরআনের হাফেজ। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকেও হাফেজা বানাবেন। সেই লক্ষ্যে মাদরাসায় পড়াশোনা করছিল সে। গত রমজানে পরিবারের সাথে ওমরাহও করেছে।

আয়েশা ছিল পাঁচ ভাইয়ের পরিবারের ও দুই বোনের একজন। সবার চোখের মণি আয়েশার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার স্বজনরা।

খোকসা শমসপুর মোল্লাপাড়ার নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আয়েশার সেজ চাচা নাসির উদ্দিন বলেন, পরিবারের সবচেয়ে আদরের মেয়েটিকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। আমাদের পরিবারে পাঁচজন হাফেজ, আয়েশার বাবা আর ভাই দুজনেই হাফেজ। আয়েশারও খুব ইচ্ছা ছিল সে হাফেজা হবে। ইতোমধ্যে ১৮ পারা কোরআন মুখস্থও করে ফেলেছিল মেয়েটা।

তিনি আরো বলেন, ‘আয়েশাকে তার বড় চাচার কবরের পাশেই জায়গা দিয়েছি আমরা। ১৮ পারা কোরআন তো ওর হৃদয়েই ছিল, বাকি ১২ পারা পূর্ণ করার সুযোগ হলো না ওর।’

আয়েশার বাবা গিয়াস উদ্দিনের ঢাকায় একটি ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানি রয়েছে। ঈদের ছুটিতে সপরিবারে খোকসার নিজের বাড়ি ও কুমারখালীর শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। বুধবার দুপুরে কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। বাসটি ফেরির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নামাজ পড়ার জন্য গিয়াস উদ্দিন তার ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নেমেছিলেন।

বাসে থেকে যান তার স্ত্রী ও মেয়ে আয়েশা। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসটি পন্টুন দিকে ছুটে গিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘চোখের সামনে স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে বাসটা ডুবে গেল। কিছুই করতে পারলাম না। পরে স্ত্রীকে লোকজনের সাহায্যে উদ্ধার করতে পারলেও মেয়েটা হারিয়ে গেল। গভীর রাতে ডুবুরিরা যখন আয়েশার নিথর দেহ উদ্ধার করে, তখন আমার সব আশার প্রদীপ নিভে যায়।’

দৌলতদিয়ায় বাসডুবিতে আয়েশাসহ ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ১১ জন নারী, আটজন শিশু ও সাতজন পুরুষ রয়েছেন। যাদের মধ্যে রাজবাড়ী জেলার শিশুসহ ১৮ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন।