সিলেটের ২ বিসিক শিল্পনগরীতে অন্তহীন সমস্যা, ড্রেনেজ উন্নয়নের লেফাফা দুরস্ত

৮০ ভাগ কারখানায় নেই অতি জরুরি ইটিপি

বিসিক মূলত শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক, কোনো কারখানা বন্ধ হোক আমরা চাই না। তবে পরিবেশটাও যাতে ঠিক থাকে, এটাও আমরা চাই। আর ইটিপির বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতর দেখে থাকে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
সিলেটের দুই বিসিক শিল্পনগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপণা লেফাফা দুরস্ত
সিলেটের দুই বিসিক শিল্পনগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপণা লেফাফা দুরস্ত |নয়া দিগন্ত

দূষণ আর দুর্গন্ধে ভুগছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সিলেটের খাদিমনগর ও গোটাটিকর শিল্পনগরী। সমস্যার অন্ত নেই এই দুই শিল্পনগরীতে। ময়লা আর দূষিত শিল্প বর্জ্য ড্রেনে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

শিল্প বর্জ্য খোলা ড্রেনে গিয়ে পড়ে পরিবেশ দূষিত করছে। এই বর্জ্যই আবার খাল হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে পড়ে মাছসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। পরিকল্পিতভাবে এই দুই শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা না করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেট নগরের পূর্ব প্রান্তে খাদিমনগর বিসিক শিল্পনগরীর সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে গত তিন বছরে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হলেও দৃশ্যত উন্নয়ন চোখে পড়েনি। এ যেনো উন্নয়নের নামে লেফাফা দুরস্ত।

একই দশা গোটাটিকর শিল্পনগরীর। সেখানেও ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ হলেও বেহাল দশা। দুই বিসিকের ভেতরের সরু ড্রেনেজ ব্যবস্থা। অল্প বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে। এছাড়া কারখানাগুলোর বর্জ্য নিরসনে ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ইটিপি না থাকায় বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এতে পুরো শিল্পনগরী দূর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। ফলে এখানে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, শিল্প কারখানার বর্জ্য নিরসনে ইটিপি নেই অনেক কারখানার। ফলে কারখানার দূষিত বর্জ্য সরাসরি খোলা ড্রেনে গিয়ে পড়ে পরিবেশে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিসিক মূলত কর্মসংস্থান তৈরি করে। তাই এখানে কোনো কারখানা বন্ধ হোক সেটা চায় না। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতর দেখে থাকে। তবে বিসিক কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোকে পরিবেশ সম্মত ইটিপি বাস্তবায়নে পরামর্শ দেয়। কারখানার বর্জ্য যাতে পরিবেশ দূষণ না করে।

শিল্প আইন বলছে, ১০ শতাংশের একটি শিল্প প্লটে আট শতাংশ জমিতে কারখানা ও দুই শতাংশ জমিতে ইটিপি নির্মাণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই খাদিমনগর ও গোটাটিকর শিল্পনগরীর কারখানাগুলোতে।

দেখা গেছে, খাদিমে আট থেকে ১০টি কারখানা ছাড়া কোনোটিতেই নেই বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি। ফলে শিল্পের বর্জ্যসহ দূষিত পানি সরাসরি ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ও এর সংশোধনীসমূহ (২০০০, ২০০২, ২০১০) আইনের আওতায় দূষণ ঘটালে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।

সংশোধিত ধারায় কখনো কখনো এর চেয়েও বেশি দণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০- যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। এছাড়া রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালাসহ আরো নানা উপ-বিধি। তবে সেই আইন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে পরিবেশ দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদফতরের কোনো পদক্ষেপ নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, খাদিমনগরের বিসিক শিল্প নগরী পাশের সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশের খালটি প্লাস্টিক, বোতল ও শিল্প বর্জ্যে ভরা। দুর্গন্ধময় কালো পানিতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে বাতাস। বিসিকের কারখানাকর্মী ও পথচারীদের মুখে হাত দিয়ে নাক বন্ধ করে চলাচল করতে হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্যে খালটি প্রায় ভরে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিসিকের সামনের যে খালটি প্রবাহিত হয়েছে, এই খাল দিয়েই বিসিকের শিল্প কারখানার বর্জ্য বংশী নদীতে গিয়ে পড়ে। পরে বংশী নদী থেকে কুশিখালী হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে প্রবাহিত হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় এলাকার লোকজন বংশী নদীর মুখটি মাটি ভরাট করে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। এতে বর্ষাকালে শিল্প এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ৭৪টি শিল্প কারখোনার মধ্যে ফুলকলি, পিউরিয়া, বনফুল, ট্রেস্টি ট্রিটসহ আট থেকে ১০টি কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশনে ইটিপি রয়েছে। বাকি ৬২-৬৪টি কারখানারই ইটিপির ক্যাপাসিটি নেই। ফলে শিল্পের বর্জ্য সরাসরি খাল, বংশী নদী ও কুশিখালী হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে নদীর মাছসহ জীববৈচিত্র্যে বিরুপ প্রভাব পড়ছে।

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে শিল্পবর্জ্য নির্গমন বাড়বে ১০৯ শতাংশ। নানা ধরনের কেমিক্যাল একদিকে যেমন জলাশয় বিষাক্ত করবে, অন্যদিকে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করবে। তাই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য উন্নত দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অনুসরণ করতে হবে এখন থেকেই। শিল্পখাতের উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর পানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে পোশাক খাতের বর্জ্য নির্গমন ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।

তথ্য বলছে, সিলেট শহরতলির খাদিমনগরে বিসিক শিল্পনগরীর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। এটি সিলেটের দ্বিতীয় শিল্পনগরী। এখানে ৭৪টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৭১টিতে পুরোদমে উৎপাদন চালু রয়েছে। বাকি তিনটির মধ্যে দু’টিতে চলছে অবকাঠামো নির্মাণ ও একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় মোট বিনিয়োগ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বার্ষিক উৎপাদন হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। পাঁচ হাজার ৭৩০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে খাদিমনগর বিসিকের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। তবে পরিবেশবান্ধব কারখানা এই বিসিক শিল্পনগরীতে মাত্র হাতেগানা কয়েকটি।

বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থ বছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে খাদিম বিসিকে দেয়াল, ড্রেন ও সড়কের উন্নয়নে ১২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এখানে ৭৩টি শিল্প গ্রুপ ১১৯টি প্লটে কারখানা করেছে।

একইভাবে সিলেটের অন্য শিল্পনগরী গোটাটিকরও ধুঁকছে নানা সমস্যায়। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে বিসিকের অভ্যন্তরে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।

কর্তৃপক্ষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে দাবি করলেও বাস্তবে এর কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। সবই যেনো লেফাফা দুরস্ত।

দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীর না থাকায় চারদিক অরক্ষিত। কোথাও ভাঙাচোরা, কোথাও কাঁচা রাস্তা। বেশিরভাগ এলাকায় ড্রেন নোংরা। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বিশুদ্ধ পানির নলকূপ। বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ পড়ে রয়েছে। পানি ও বিদ্যুতের লাইনও অপর্যাপ্ত।

অন্যদিকে ১৯৬৪ সালে কাজ শুরু হলেও ১৯৭৮ সালে গোটাটিকর বিসিকের যাত্রা শুরু। ৭২টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে এ বিসিকে ৬৬টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টিই মিষ্টি ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনের সাথে যুক্ত। এর মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় মোট বিনিয়োগ ১৫ কোটি টাকা। বার্ষিক উৎপাদন হচ্ছে ২৩০ কোটি টাকা। চার হাজার ৪০০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে গোটাটিকর বিসিকের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়।

বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গোটাটিকর বিসিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামনের সড়কসহ আশপাশের সব স্থাপনা উঁচু। ফলে ভেতরে নালার ব্যবস্থা থাকলেও বিসিকের পানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিসিক শিল্পমালিক সমিতির প্রতিনিধি মঈন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় এখানকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলেই ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঢুকে আমাদের লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। এখানে ভোগান্তির শেষ নেই।

তবে গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবিদুর রহমান খান বলেন, বিসিকের ভেতরের নালাগুলো সংস্কার করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে।

বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: সুহেল হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিসিক মূলত শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক, কোনো কারখানা বন্ধ হোক আমরা চাই না। তবে পরিবেশটাও যাতে ঠিক থাকে, এটাও আমরা চাই। আর ইটিপির বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতর দেখে থাকে।

তিনি আরো বলেন, গত তিন বছরে খাদিম বিসিকে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। মালিক সমিতির সহায়তায় ৩৬টি সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ চলছে। বর্তমানে চারজন সিকিউরিটি গার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। এটা ১০ জন সিকিউরিটি গার্ডে উন্নীত করা হবে।