বরগুনা প্রতিনিধি ও তালতলী সংবাদদাতা
বরগুনার তালতলীতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মিয়া মুস্তাফিজুর রহমান মোস্তাককে হত্যার ষড়যন্ত্র ও ভাড়াটে খুনি নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম মোল্লাসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন মোস্তাকের বড় ভাই ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মিয়া রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নজরুল ইসলাম মোল্লা ও অপর অভিযুক্তরা।
বুধবার বিকেলে তালতলী প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মোস্তাকসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছে। তার দাবি, এরই মধ্যে স্থানীয় জনতা বিদেশী পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ পাঁচজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এ ঘটনার পেছনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোল্লাসহ কয়েকজন নেতা কলকাঠি নাড়ছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
রিয়াজ বলেন, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের পেছনে কারা রয়েছে, তা চিহ্নিত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন, খোঁজ নিয়ে দেখছেন। তিনি বলেন, মোস্তাকের বিরুদ্ধে তার কোনো রাগ বা ক্ষোভ থাকলে দলীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে সুপারিশ করতেন না।
মোস্তাকপন্থী নেতা মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবও দাবি করেন, মোস্তাককে হত্যার উদ্দেশ্যেই তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সন্ত্রাসী ভাড়া করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
অপর অভিযুক্ত তালতলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম মামুন অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পুলিশের হেফাজতে থাকা পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পিস্তল-গুলিসহ ৫ জন আটক
এদিকে বুধবার দুপুরে তালতলী উপজেলার ছোটবগী ইউনিয়নের পশ্চিম গাবতলী এলাকা থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিনসহ পাঁচজনকে আটক করে স্থানীয় জনতা। পরে তাদের তালতলী থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন—নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাঠালতলী গ্রামের জিহাদ খান (৩৫), বরগুনা সদর উপজেলার আমড়াঝুড়ি গ্রামের হৃদয় মোল্লা (২৫) ও জামাল মল্লিক (২৭) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিশানবাড়িয়া গ্রামের লিমন সিকদার (২৮) ও অনিক মজুমদার (২৫)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তালতলীতে বিএনপির দুই পক্ষ পৃথক কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম মামুন এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সদস্যসচিব মিয়া মুস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক।
একই সময়ে দুই পক্ষ কর্মসূচি ঘোষণা করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দেয়। পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে কর্মসূচি স্থগিত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর কিছুক্ষণ পর পশ্চিম গাবতলী এলাকা থেকে স্থানীয়রা পিস্তল ও গুলিসহ পাঁচজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
তালতলী থানার ওসি মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, বিএনপির দুই পক্ষ একই স্থানে পৃথক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় সমাবেশ বাতিল করে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়রা পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ পাঁচজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলন
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তালতলীতে বিএনপির অপর একটি পক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে মোস্তাকের বড় ভাই রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজের ফেসবুক লাইভে দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম ও সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম মামুনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তারা অভিযোগ করেন, গত ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে তালতলীতে মোস্তাকের আয়োজিত কর্মসূচিতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোল্লাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়। ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার প্রতিবাদে তারা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরে একই স্থান ও সময়ে মোস্তাকপন্থীরাও কর্মসূচি ঘোষণা করলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সংঘাতের আশঙ্কায় উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে উভয় পক্ষ কর্মসূচি স্থগিত করে।
পশ্চিম গাবতলী এলাকায় অস্ত্রসহ পাঁচজন আটকের ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেয়ারও প্রতিবাদ জানান তারা। নেতারা বলেন, কোনো ঘটনার সাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জড়ানোর আগে সুষ্ঠু তদন্তের ওপর আস্থা রাখা উচিত। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান অসীম ও সাইফুল ইসলাম মামুন, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকন মামুন, ছাত্রদল সভাপতি হাওলাদার মোহাম্মদ নাসির, শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি শাহ আলম হাওলাদার, কৃষক দলের সভাপতি জাফর হাওলাদার, জিয়া মঞ্চের উপজেলা সভাপতি জাকির খলিফা, ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক অমিতসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



