দোয়ারাবাজারে নির্বিচারে বালু উত্তোলনে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি

টাকার বিনিময়ে নদীর পাড় বিক্রি ও বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)

Location :

Dowarabazar
অবৈধ বালু উত্তোলনে ফসলি জমি এখন পুকুর, নদীর পাড় যেন মরণফাঁদ
অবৈধ বালু উত্তোলনে ফসলি জমি এখন পুকুর, নদীর পাড় যেন মরণফাঁদ |নয়া দিগন্ত

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নে টাকার লোভে এক শ্রেণির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কর্তৃক ফসলি জমি খনন করে বালু লুটের তাণ্ডবে মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে একের পর এক ফসলের মাঠ।

কোথাও জমির মালিককে টাকা দিয়ে, কোথাও আবার রাতের আঁধারে জোরপূর্বক লুট করে নেয়া হচ্ছে বালু। প্রভাবশালী বালু খেকোরা আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সুনাইত্যা, দ্বীনেরটুক ও সিরাজপুর গ্রামের ফসলি জমি ও মরা চেলা নদীর পাড় কেটে বালু লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে।

ফলে মরা চেলা নদীর পাড়ের স্থাপনা ও ফসলি জমি ভেঙে ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে। নষ্ট হচ্ছে চলাচলের রাস্তা। রাতভর লুট হওয়া বালু পরিবহনকারী বড় বড় ট্রাকের তাণ্ডবে এসব গ্রামের অধিকাংশ ছোট-বড় সড়ক ভেঙে ইতোমধ্যে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই এমন তাণ্ডব চলছে।

সরেজমিনে এসব গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বালু লুটেরাদের তাণ্ডবে গ্রামের ভেতর শতাধিক ফসলি জমি নষ্ট হয়ে পুকুরে পরিণত হয়েছে। মরা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করায় নদী আর ফসলি জমি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুনাইত্যা গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, সুনাইত্যা গ্রামে মরা চেলা নদীর পাড় কেটে বালু লুট করায় এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বসতঘর নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। দিনের বেলায় বালু লুটকারীরা নিজেদের ক্রয়কৃত জায়গা হতে বালু লুট করলেও, রাতের বেলায় অন্যের জমি কেটে বালু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এসব চক্র প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারে না। তাদের তাণ্ডবে সন্ধ্যার পর সড়কে চলাচল করতে দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকতে হয়।

তিনি বলেন, বালু দস্যুদের সাথে প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে প্রায়ই বসে সময় কাটাতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে তারা অভিযানের নামে নাটক সাজিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে।

সিরাজপুর গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, সিরাজপুর এলাকা থেকে মরা নদীর বালু লুট করায় নদীর আকার যেমন দিন দিন বড় হচ্ছে, তেমনি চলাচলের সড়কও নষ্ট হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, দিনের বেলায় ছোট ছোট পিক-আপ দিয়ে বালু লুট করলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বড় বড় ট্রাক্টর দিয়ে বালু পরিবহন করা হয়। এসব এলাকায় বড় ধরনের সড়ক না থাকায় চার ফুট প্রস্থ রাস্তা দিয়ে তাদের চলাচল করতে হয়। আর বালু লুটপাটের তাণ্ডবে এ সড়কগুলো ভেঙে খানাখন্দে ভরে গেছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভেঙে নদীতে পড়ছে। ফলে রাস্তা চলাচলে স্থানীয়দের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা গেছে সোনালী চেলা নদীতেও। দিনে-দুপুরে সোনালীচেলা নদীর পাড় কেটে বালু লুটপাট করায় শুষ্ক মৌসুমেও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা প্রশাসন প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই সোনালীচেলা নদীটিকে বালুমহল হিসেবে ইজারা দিচ্ছে। কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদার ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের যোগসাজশে নদীর পাড় কেটে বালু সংগ্রহ করছে। গত দুই বছরে নদীর পাড় কাটার ফলে সারপিনপাড়া ও পূর্বচাইরগাঁও গ্রামের শতাধিক পাকা ও কাঁচা ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনের কবলে সারপিনপাড়া, পূর্বচাইরগাঁও, সোনাপুর, রহিমের পাড়া ও নাছিমপুরসহ আশপাশের ছয়টি গ্রাম এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর পাড় সংলগ্ন জমির মালিকরা নগদ টাকার বিনিময়ে বালু ব্যবসায়ীদের কাছে পাড় বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা পুরো এলাকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বালু কেনার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পাড় কেটে বালু তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, নদীর পাড় ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও তা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ, তবে প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই এমন তাণ্ডব চলছে বলে তারা জানান।

দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ইতোমধ্যে ২০-২২ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। বাকি এলাকায়ও তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত আছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিং জানান, টাকার বিনিময়ে নদীর পাড় বিক্রি ও বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।