ঝালকাঠিতে শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে দ্বিগুণ লোডশেডিং

জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেয়া জরুরি।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি

Location :

Jhalokati
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি |নয়া দিগন্ত

চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঝালকাঠি জেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জেলার চার উপজেলা মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা। শহরে লোডশেডিংয়ের ফলে মিল-কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। তবে, শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং দ্বিগুণ হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২-২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

সূত্রটি আরো জানায়, ৩৩ কেভি স্ক্যাডা সিস্টেমের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে লোড নিয়ন্ত্রণ করা হয়, ফলে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং বন্ধ রাখতে চাইলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপসহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম বলেন, গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেয়া হয়, তার ভিত্তিতেই রোটেশন করে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। কোনো ফিডারে ১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলে আমরা ছয়-আট মেগাওয়াট পাচ্ছি। বাকি ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্রিড থেকে সরবরাহ আরো কমে গেলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেড়ে যায়।

এদিকে শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং দ্বিগুণ বেশি হচ্ছে। জেলার রাজাপুর উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় তিন দশমিক পাঁচ মেগাওয়াট। এতে এলাকার একটি বড় অংশে লোডশেডিং করা হচ্ছে।

জাতীয় গ্রিডে লো ফ্রিকোয়েন্সি দেখা দেয়ায় ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের মাধ্যমে ৩৩ কেভি ফিডার বন্ধ রেখে লোড ম্যানেজমেন্ট করছে, ফলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থী নলছিটির সুমাইয়া আক্তার জানায়, দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনা করতে পারছি না। গরমে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়।

আরেক এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝালকাঠি শহরের রাকিব হোসেন জানায়, সন্ধ্যার সময়ই সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়। এ সময় পড়ার চাপ বেশি থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছি না।

এদিকে ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। ঝালকাঠি শহরের ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতা কমে যায়, আবার সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হয় সব। মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছি।

ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং ও চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় দ্বিতীয় কলকাতা খ্যাত বাণিজ্যিক শহরে পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বাজারে পণ্যের চাহিদা সঠিকভাবে সরবরাহ করতে পারছি না।

সমাজকর্মী আতিকুর রহমান বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং এখন জনজীবনের বড় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেয়া জরুরি।

এ লক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, সরকারি দফতরসহ নগর এলাকার ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল ও হাইব্রিড প্রযুক্তি স্থাপন, দেশীয় উৎপাদন ও সহজ আমদানির মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

ঝালকাঠি শহরের ইজিবাইক চালক রেজাউল করীম সরদার বলেন, তেলের সঙ্কটে মোটরযানে চাপ কম থাকায় যাত্রীরা এখন ইজিবাইকে বেশি চলাচল করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। ফলে ঠিকভাবে ট্রিপ (খেপ) মারতে পারছি না।

এদিকে তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতে না পেরে দুর্ভোগ বাড়ছে জেলার মানুষের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরিশালের দু’টি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব এলাকায় মোট চাহিদা প্রায় ২৮০ মেগাওয়াট হলেও বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ে ঝালকাঠিবাসী এখন দিশেহারা।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো: জুলফিকার রহমান বলেন, জেলার উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্নভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। রাজাপুর ও কাঠালিয়া ফিডারে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রিড থেকে এবং নলছিটি ও ঝালকাঠি ফিডারে বরিশাল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে (ঢাকা থেকে) লাইন বন্ধ করে দিলে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লোডশেডিং তৈরি হয়।