তিন বছরেও চালু হয়নি সিলেটের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালটির দীর্ঘসূত্রতার শুরু আরো আগে। প্রায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর চৌহাট্টা-সংলগ্ন আলিয়া মাদরাসা মাঠ এলাকায় নির্মিত হাসপাতালটির অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গায় নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়।

এমজেএইচ জামিল, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
অব্যবহৃত সিলেটের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল
অব্যবহৃত সিলেটের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল |নয়া দিগন্ত

নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। এরপর একের পর এক উদ্যোগ নিলে আলোর মুখ দেখেনি হাসপাতালটি। চলতি বছরের গত ১৫ জুন দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে পরিচালনার চূড়ান্ত অনুমোদনও মিলেছে। তবুও চালু হয়নি সিলেটের বহুল আলোচিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত জেলা হাসপাতালটি।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালটি পরিদর্শন শেষে আবারো নতুন সময়সীমা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন-আগামী তিন মাসের মধ্যে চালু হবে হাসপাতালটি। ফলে নতুন ঘোষণায় আশার পাশাপাশি সিলেটবাসীর প্রশ্ন, তিন বছরেও যে হাসপাতাল চালু হয়নি, এবার তিন মাসে তা কী সম্ভব হবে?

হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, ফার্নিচার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর লক্ষ্যে দ্রুতগতিতে কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ সময় বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপিও উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চিকিৎসক ও নার্স সঙ্কট মোকাবিলায় আগামী তিন মাসের মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ চিকিৎসক ও ৫ হাজার নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চিকিৎসক-নার্সদের নিরাপত্তায় হাসপাতালগুলোতে পুলিশ ক্যাম্প বাড়ানোর পাশাপাশি আনসার ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।

তবে নতুন এই তিন মাসের ঘোষণা ঘিরে সংশয় তৈরি হওয়ার কারণও রয়েছে। হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস এবারই প্রথম নয়। গত ১৫ জুন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ জটিলতার পর হাসপাতালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া গেছে।

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিমেবি) তত্ত্বাবধানে হাসপাতালটি চালু এবং দ্রুত লোকবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি কেনার কথা বলা হয়েছিল।

এর আগে, গত ২০ এপ্রিল হাসপাতাল পরিদর্শন এবং ৩১ মে এক অনুষ্ঠানে দ্রুত চালুর আশ্বাসও দেয়া হয়। কিন্তু ১৫ জুনের অনুমোদনের পরও প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেছে; হাসপাতালের দরজা খোলেনি। বরং এখন আবার নতুন করে তিন মাসের সময়সীমা দেয়া হলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালটির দীর্ঘসূত্রতার শুরু আরো আগে। প্রায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর চৌহাট্টা-সংলগ্ন আলিয়া মাদরাসা মাঠ এলাকায় নির্মিত হাসপাতালটির অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গায় নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।

ভবন নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতালটি কে পরিচালনা করবে-সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদফতর নাকি সিভিল সার্জন কার্যালয়-এ নিয়ে দীর্ঘদিন জটিলতা চলে। পাশাপাশি লোকবল, লজিস্টিক সাপোর্ট ও তদারকি নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও সেখানে শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১৫ জুন সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাসপাতালটি পরিচালনার অনুমোদন পাওয়ায় আশার আলো দেখা দেয়। কিন্তু অনুমোদনের পরও প্রায় তিন মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন সময়সীমার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হাসপাতালটির অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এবং অতীতে একাধিকবার দ্রুত চালুর আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবার ঘোষিত তিন মাস কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক নিয়োগের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের পর অবকাঠামোগত কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃজন শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে লোকবল নিয়োগ করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

পাশাপাশি সিলেটে একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র-পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও শিগগিরই একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল এবং ৪৫০ শয্যার অসম্পূর্ণ ক্যান্সার ইনস্টিটিউট চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

প্রায় তিন বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা হাসপাতালটির অবকাঠামোতে রয়েছে বেজমেন্টে কারপার্কিং, প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার ও ওয়েটিং রুম, দ্বিতীয় তলায় বহির্বিভাগ ও কনসালট্যান্ট চেম্বার, তৃতীয় তলায় ডায়াগনস্টিক, চতুর্থ তলায় কার্ডিয়াক ও জেনারেল ওটি, আইসিসিইউ ও সিসিইউ, পঞ্চম তলায় গাইনি, অপথালমোলজি, অর্থোপেডিক্স ও ইএনটি এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন। রয়েছে ১৯টি আইসিইউ, নয়টি সিসিইউ বেড ও ৪০টি কেবিন।

বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল যখন বছরের পর বছর চিকিৎসাসেবার বাইরে পড়ে থাকে, তখন নতুন কোনো আশ্বাসের চেয়ে তার বাস্তবায়নই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুক্রবারের ঘোষিত তিন মাসের সময়সীমা এখন শুধু আরেকটি প্রতিশ্রুতি নয়—এটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় সিলেটবাসী। এবারো যদি সময়সীমা পেরিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, হাসপাতাল চালুর জন্য আর কত সময় অপেক্ষা করতে হবে?