রামগড়ে ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে পিআইও করিমের বিরুদ্ধে তদন্ত

‘আমাকে সভাপতি না দেখিয়ে আবু আহমেদ নামে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দেখিয়ে এক টন চাল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ এ নামে আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি নেই। আমরা কোনো চাল পাইনি এবং কে এ চাল তুলে নিয়েছে তাও জানি না।’

বেলাল হোসাইন, রামগড় (খাগড়াছড়ি)

Location :

Ramgarh
এস এম এ করিম
এস এম এ করিম |নয়া দিগন্ত

খাগড়াছড়ির রামগড়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এস এম এ করিমের বিরুদ্ধে ২৭ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ২৭ টন চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

সোমবার (৬ জুলাই) রামগড় পৌরসভার সম্মেলন কক্ষে ভুক্তভোগীদের উপস্থিতিতে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি করেন জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি।

এর আগে, অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা নড়াইলে কর্মরত থাকাকালীন সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হন এবং ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও সরকারি কার্যালয়ে বসে প্রকাশ্যে ধূমপানের অভিযোগ ওঠে বলে জানা যায়।

এবার রামগড় উপজেলায় যোগ দেয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণে অনিয়ম, ভুয়া নামে চাল উত্তোলন এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছেন।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফকে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মো: শরিফুর রহমান সদস্য হিসেবে রয়েছেন এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা দুর্জয় গোস্বামী সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের বরাদ্দ অনুযায়ী গত ১৫ জুন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দু’টি পৃথক স্মারকের মাধ্যমে রামগড় উপজেলার ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ২৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের এক মেট্রিক টন (১,০০০ কেজি) করে চাল পাওয়ার কথা ছিল।

তবে অভিযোগ উঠেছে, তিনটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রকৃত দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিবর্তে ভুয়া ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো চাল বা অর্থ কিছুই পায়নি। এর মাধ্যমে তৈছালা মদিনাতুল উলুম মাদরাসা, চৌধুরীপাড়া নুরানী মাদরাসা ও ইসলামপুর রশিদিয়া মাদরাসার নামে বরাদ্দকৃত চাল সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এছাড়া, বালুখালী আলো তালীমুল কুরআন মাদরাসা নামে একটি ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলেও এক টন চাল বরাদ্দ দেখিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে আসা অভিযোগে আরো জানা যায়, ১২টি মসজিদ ও নূরানী মাদরাসাকে চালের পরিবর্তে মাত্র নয় হাজার টাকা করে, ১০টি মন্দির ও বৌদ্ধবিহারকে সাত হাজার টাকা করে এবং একটি মাদরাসাকে ২০ হাজার টাকা নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে।

ইসলামপুর রশিদিয়া মাদরাসার সভাপতি আব্দুর রউফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাকে সভাপতি না দেখিয়ে আবু আহমেদ নামে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দেখিয়ে এক টন চাল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ এ নামে আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি নেই। আমরা কোনো চাল পাইনি এবং কে এ চাল তুলে নিয়েছে তাও জানি না।

বলিটিলা তালিমুল কুরআন মাদরাসার সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমাদের মাদরাসার জন্য এক টন চাল বরাদ্দ থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের চাল না দিয়ে মাত্র নয় হাজার নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বরাদ্দের এ চাল প্রতি মেট্রিক টন ৩৩ হাজার টাকা দরে খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী শামীম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সাথে পিআইওর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত তদন্তে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে পিআইও এস এম এ করিমের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের বিষয়টি শুনতেই তিনি কল কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এস এম এ করিম ২৮ মে ২০২৫ সালে রামগড়ে যোগ দেন। তার আগে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেই সময় সরকারি কার্যালয়ে বসে তার প্রকাশ্যে ধূমপানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তারও আগে, ২০২০ সালে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ১৬টি সেতু নির্মাণ প্রকল্পের টেন্ডারে শিডিউল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সেই সময় শিডিউল বিক্রির সংখ্যা কম দেখিয়ে সাত লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল।