মাছ চাষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ এবং অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সুষম খাদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৩৫০ জন মৎস্যচাষিকে। দেশের মাছ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় ময়মনসিংহ অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন আরো কয়েকগুণ বাড়ানোর লক্ষ্যেই পাঁচ দিনব্যাপী এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের উদ্যোগে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় আয়োজিত এসব কর্মশালায় মৎস্য খামারিদের আধুনিক ও টেকসই চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এতে ময়মনসিংহের চারটি উপজেলা এবং নেত্রকোনার একটি উপজেলায় মোট পাঁচটি দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ৭০ জন করে মোট ৩৫০ জন মৎস্যচাষি, ফিড ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
‘গুণগত খাদ্য পরিমিত পরিমাণ, মাছের বৃদ্ধি চাষির লাভ’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত কর্মশালাগুলোর সার্বিক সহযোগিতা করে ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। প্রথম কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। পরে পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহের ফুলপুর, মুক্তাগাছা, সদর (শম্ভুগঞ্জ) ও ফুলবাড়িয়ায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
প্রতিদিনের কর্মশালা দুইটি সেশনে বিভক্ত ছিল। প্রথম সেশনে মাছের বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা এবং দ্বিতীয় সেশনে মাঠভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী।
কর্মশালাকে আরো অংশগ্রহণমূলক করতে প্রশিক্ষণার্থীদের পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল পুকুরের মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রয়োগ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করে। পরবর্তীতে দলভিত্তিক তথ্য উপস্থাপন করে পোস্টার প্রদর্শন করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়নের জন্য কুইজের আয়োজনও করা হয়।
অনুষ্ঠানে ইউএসজিবিসির গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। সঠিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা খামারিদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের এভিপি সামিউল আলিম বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনই তাদের লক্ষ্য।’
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যালমুক্ত মাছের খাদ্য উৎপাদন করে, যা আন্তর্জাতিক আইএসও ও এইচএসিসিপি মানদণ্ডে স্বীকৃত।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক এস এম এ হক বলেন, ‘মাছ চাষে লাভবান হওয়ার জন্য পুকুর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মজুদ ঘনত্ব, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং অ্যামোনিয়ার মাত্রা সম্পর্কে অজ্ঞতা খামারিদের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। তিনি সুষম খাদ্য ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’
প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া ফুলপুরের মৎস্যচাষি মো: আব্দুল করিম বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণ থেকে পুকুর ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য প্রয়োগ এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা উৎপাদন খরচ কমাতে এবং ফলন বাড়াতে সহায়ক হবে।’
স্থানীয় ফিড ডিলার মো: সোহেল রানা জানান, এ ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের খামারিদের আরো কার্যকর পরামর্শ দিতে সহায়তা করবে, যা উন্নতমানের ফিড ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকায় অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আধুনিক ও ব্যয়সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে পুকুর ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য ব্যবহার এবং উন্নত উৎপাদন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।



