ডিমলায় আট মাসে ৪৬ অপমৃত্যু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা

‘বাড়ির পাশেই সুইচগেট। ওখানেই প্রতিদিনের চলাফেরা। একটু অসাবধানতায় আমার মা-টা ক্যানেলের পানিতে পড়ে তলিয়ে গেল। এলাকার এই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতো, তবে হয়তো আজ আমার মেয়েকে অকালে প্রাণ হারাতে হতো না।’

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা

Location :

Dimla
ডিমলায় বেড়েছে অপমৃত্যুর সংখ্যা
ডিমলায় বেড়েছে অপমৃত্যুর সংখ্যা |প্রতীকী ছবি

নীলফামারীর ডিমলায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট) ৪৬টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ডিমলা থানার সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে পানিতে ডুবেই মারা গেছে ২৪ জন, যার সিংহভাগই শিশু।

মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। এই পথ বেছে নিয়েছেন ১১ জন। এছাড়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ছয়জন, হত্যাকাণ্ডে দু’জন, বজ্রপাতে একজন ও অন্যান্য ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, পানিতে ডোবা ও আত্মহত্যা এই দুই কারণেই মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৬ শতাংশ (৩৫ জন) ঘটেছে। থানার বয়সভিত্তিক নথিতে শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সীমান্তঘেঁষা এই উপজেলায় মাত্র আট মাসে ২৪ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যু এক বড় সতর্কবার্তা। বসতবাড়ির কাছের অরক্ষিত পুকুর, ডোবা, খাল ও সেচ ক্যানেল শিশুদের জন্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। স্বজনদের সামান্য অসতর্কতায় ঘটে যাচ্ছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

সম্প্রতি নাউতারা ইউনিয়নের কাঁকড়া তুহিন বাজার সুইচগেট এলাকায় ক্যানেলের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় আবুল হোসেনের ১২ বছর বয়সী মেয়ে মোসা: পাখি আক্তারের। মেয়েকে হারানোর শোক সামলে ওঠার আগেই অশ্রুসজল চোখে আবুল হোসেন বলেন, বাড়ির পাশেই সুইচগেট। ওখানেই প্রতিদিনের চলাফেরা। একটু অসাবধানতায় আমার মা-টা ক্যানেলের পানিতে পড়ে তলিয়ে গেল। এলাকার এই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতো, তবে হয়তো আজ আমার মেয়েকে অকালে প্রাণ হারাতে হতো না। কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’

নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশিক ইমতিয়াজ মোর্শেদ মনি বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে একের পর এক পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্টে অকালমৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা ইতোমধ্যে ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় ও উন্মুক্ত ক্যানেল চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছি। স্থানীয়দের সচেতন করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে অবিলম্বে নিরাপত্তাবেষ্টনী ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

থানার তথ্যানুযায়ী, নাউতারা ইউনিয়নে অপমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া খালিশা চাপানী, ডিমলা ও ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের নামও নথিতে একাধিকবার এসেছে। পানিতে ডোবার পরেই সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটছে আত্মহত্যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, মানসিক কাউন্সেলিং ও সামাজিক-পারিবারিক সঙ্কট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন। অন্যদিকে, কৃষিনির্ভর ডিমলায় অনিয়ন্ত্রিত সেচযন্ত্র ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তারের কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: ইমরানুজ্জামান (ইউএনও) নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে পরিবারের সচেতনতার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় ও স্থানগুলো চিহ্নিত করা হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘অপমৃত্যুর প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষ করে শিশুমৃত্যু রোধে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে পুলিশ।’