বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। যারা জনগণের স্পষ্ট রায়কে অস্বীকার করে, তারা প্রকৃত অর্থে জনগণের সরকার হতে পারে না। জনগণের রায় আজ হোক বা কাল হোক, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে গাজীপুর মহানগরের শিববাড়ী মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে সমাবেশটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজীপুর মহানগরের আমির অধ্যাপক মুহাম্মদ জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান দাবি করেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাই সেই গণরায় উপেক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের বেতন কোনো রাজনৈতিক দল দেয় না; জনগণের করের টাকায় আপনাদের বেতন হয়। আপনারা জনগণের কর্মচারী, কোনো দলের নয়। তাই জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রনেতাদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নিরপরাধ ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারকে জবাব দিতে হবে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে বলেন, ‘এই ঘটনার সাথে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করুন। ছাত্রশিবির কোথাও উসকানি দিয়েছে কি না, তার প্রমাণ দিন। অন্যথায় নিরপরাধ ছাত্রনেতাদের ওপর হামলার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দেশকে স্থিতিশীল রাখতে চাইলে অবিলম্বে দায়ীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে বর্তমান সরকারও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আরো বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ও পলাতক ফ্যাসিবাদী শক্তির মধ্যে এক ধরনের গোপন সমঝোতার আভাস জনগণ দেখতে পাচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘জনগণ সংবিধানের আংশিক সংশোধন নয়, মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার চায়। সেই সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
জুলাই গণহত্যার বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে রায় হয়েছে, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করে জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না।
তিনি আরো বলেন, ‘জনগণ যদি বারবার বঞ্চিত হয়, তাহলে বিদেশী কোনো শক্তিই কোনো সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারবে না।’
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে জনগণের আন্দোলনকে উপেক্ষা করা হলে দেশ আবারো বৃহত্তর গণআন্দোলনের দিকে অগ্রসর হবে। প্রয়োজনে আরেকটি গণআন্দোলনের ডাক দেয়া হবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডা: আতিকুর রহমান মুজাহিদ এমপি বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের ওপর এখনও নির্যাতন চলছে। এটি কোনোভাবেই জুলাইয়ের চেতনার বাস্তবায়ন হতে পারে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও অঞ্চল পরিচালক উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণ নামমাত্র সংশোধন নয়, মৌলিক সংস্কার চায়।’
সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গাজীপুর মহানগরের সভাপতি হোসাইন আল মামুন, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মো. খায়রুল হাসান ও মো. হোসেন আলী, গাজীপুর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা শেফাউল হক, সংসদ সদস্য মো. সালাহ উদ্দীন আইউবী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে জামায়াত মনোনীত মেয়র প্রার্থী ড. হাফিজুর রহমান, এনসিপি নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান, আব্দুল্লাহ আল মুহিন, রঙ্গণ সাংস্কৃতিক সংসদের এটিএম মুজাহিদুল ইসলাম, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. আফজাল হোসাইন, মো. আনিসুর রহমান বিশ্বাস, মো. আজহারুল ইসলাম মোল্লা, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, এনসিপি নেতা আরমান হোসাইন, মুহাম্মদ উল্লাহ, গাজীপুর মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. ইয়াসিন আরাফাত, আবু সিনা নুরুল ইসলাম মামুন, মো. নজরুল ইসলাম, মো. নেয়ামত উল্লাহ শাকের, আব্দুল জলীল আকন্দ, তরিকুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার ইসমাইল পাঠান, তাসনিম আলম, মাঈনুল ইসলাম, মো. ছাদেকুজ্জামান খান, মো. কবির হোসাইন, মো. আনোয়ার হোসাইন ভূঁইয়া, মো. নিয়াজ উদ্দিন, মাওলানা ফরহাদ হোসাইন, মাওলানা আকরামুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মো. শামীম মৃধা, মো. মুজাহিদুল ইসলাম এবং নাবিল আল ওয়ালিদ।
সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন।
বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে গণহত্যার বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তারা জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান জানান।
সমাবেশে গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন।



