কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় অবৈধ পাহাড় কাটার সময় মাটিচাপা পড়ে নুরুল আমিন (৩০) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত নুরুল আমিন মির আহমদের ছেলে। জন্ম চরপাড়ায় হলেও বর্তমানে তিনি জুম্মাপাড়ায় বসবাস করতেন।
স্থানীয়দের মতে, এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পরিবেশ ধ্বংস, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম খেলায় পরিণত হওয়া পাহাড় কাটা সিন্ডিকেটের ভয়াবহ পরিণতি।
স্থানীয়রা জানায়, হেলাল নামের এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছিল। রাত ও ভোরের অন্ধকারকে ঢাল বানিয়ে চলছিল এই অবৈধ কার্যক্রম। নুরুল আমিন ছিলেন সেই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের একজন। জীবিকার তাগিদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই তাকে পাহাড় কাটার কাজে নামতে হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরের অন্ধকারে হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়লে নুরুল আমিন মাটির নিচে সম্পূর্ণ চাপা পড়েন। সহকর্মীরা আতঙ্কে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেও পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার কাজে নামেন। দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে সব শেষ।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নুরুল আমিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ঘটনাস্থলজুড়ে নেমে আসে হৃদয়বিদারক শোক।
এই মৃত্যুর সাথে সাথে আবার সামনে এসেছে পাহাড় কেটে পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাটি কাটার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাহাড় কাটা শুধু একটি শ্রমিকের জীবন কেড়ে নেয়নি, এটি ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, বন উজাড় করছে, বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস করছে এবং পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যকে বিপন্ন করে তুলছে। বর্ষা মৌসুমে এই কাটা পাহাড়ই পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। ঘরবাড়ি ধ্বংস, সড়ক ভেঙে যাওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বারবার।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, জালিয়াপালং এলাকায় রাত ও ভোরে নিয়মিত পাহাড় কাটা হলেও কার্যকর কোনো নজরদারি ছিল না। প্রশাসনের চোখের সামনেই দিনের পর দিন পাহাড় কাটা হলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে একদিকে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে জীবন হারাচ্ছেন অসহায় শ্রমজীবী মানুষ।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহমদ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। লাশ সুরতহাল শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরো জানান, অবৈধ পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ প্রচলিত ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, মৃত্যুর পর তদন্ত আর আশ্বাসই কি শেষ কথা? তারা অবিলম্বে অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, ঘটনার সাথে জড়িত হেলালসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহত নুরুল আমিনের পরিবারের জন্য সরকারি ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানিয়েছেন।



