হাসনাত আব্দুল্লাহ

উত্তরাধিকারসূত্রে নেতৃত্ব নয় আমরা চাই যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক

যা চলে গেছে, তা চলে গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের পরিণতি আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মানুষ মাঝেমধ্যেই বলে— তারা যেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর টেলিগ্রামের দলে পরিণত হয়েছে।

রাশিদুল ইসলাম বোরহান, গাংনী (মেহেরপুর)

Location :

Gangni
হাসনাত আব্দুল্লাহ
হাসনাত আব্দুল্লাহ |নয়া দিগন্ত

যা চলে গেছে, তা চলে গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের পরিণতি আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মানুষ মাঝেমধ্যেই বলে— তারা যেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর টেলিগ্রামের দলে পরিণত হয়েছে। আমাদের প্রজন্ম অন্তত বলতে পারবে, বিশ্বের এক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। কামান, হেলিকপ্টার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশের সমর্থন— কোনো কিছুই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। যারা বলেছিল "পালাব না", তারাই শেষ পর্যন্ত পালিয়ে গেছে। তাই অতীত নিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাবা প্রয়োজন।

সোমবার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যায় মেহেরপুরের গাংনীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর পদযাত্রা ও পথসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি।

গাংনী উপজেলার শহরের বাসস্ট্যান্ডে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখ্য সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সাকিল আহমাদ।

পুলিশকে উদ্দেশ্যে করে হাসনাত আরও বলেন, পুলিশ প্রশাসন, তারাও রাষ্ট্রের কর্মচারী। তাদের বেতন, পারিবারিক জীবন, সন্তানদের শিক্ষা— এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার। একটি কল্যাণরাষ্ট্রে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে নেতৃত্ব বংশগত হবে না, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তৈরি হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন বিশ্বাস করতে পারে— একদিন সেও সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে পারবে।

তিনি আরো বলেন, আজ আমরা দেখছি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ শিক্ষক বা সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়ের নজির তৈরি করা হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। পরিস্থিতি সবসময় এক রকম থাকে না। তাই দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক আচরণই সবচেয়ে বড় শক্তি।

হাসনাত বলেন, আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো পরিবারতন্ত্র। আগে একজন নেতা ক্ষমতায় থাকতেন, পরে তার সন্তান নেতৃত্বের আসনে বসতেন। ফলে সাধারণ কর্মীদের জন্য নেতৃত্বের দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে নেতৃত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে নির্ধারিত হবে। আমরা চাই যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক।

স্থানীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে হাসনাত বলেন, আপনি এলাকায় একজন নেতার জন্য জীবনভর কাজ করছেন, অথচ সেই নেতা রাজধানীতে অন্য দলের নেতার সঙ্গে বসে একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন। এক নেতার ছেলে আরেক নেতার মেয়েকে বিয়ে করছে, আর সাধারণ কর্মীরা বিভক্ত হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। এতে লাভ কার? ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। একজন সাধারণ কর্মী তার মায়ের ওষুধ কেনার জন্য সংগ্রাম করেন, কিন্তু যাঁর জন্য তিনি রাজনীতি করেন, সেই নেতা নিয়মিত বিদেশে চিকিৎসা করান। এই বৈষম্য দূর করতে হবে। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, কোনো বিশেষ পরিবারের সুবিধার জন্য নয়। বিগত বছরগুলোতে বহু রাজনৈতিক কর্মী মামলা, জেল-জুলুম ও পালিয়ে থাকার কষ্ট সহ্য করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক প্রভাবশালী নেতার ব্যবসা-বাণিজ্য বা সম্পদের তেমন ক্ষতি হয়নি। কষ্টটা বেশি ভোগ করেছেন তৃণমূলের কর্মীরাই। তাই রাজনীতিতে ত্যাগের মূল্যায়ন হতে হবে, শুধু ক্ষমতাবানদের নয়।

তিনি বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো সরকারি অফিসে কেউ দলীয় পরিচয় দেখিয়ে টেবিল চাপড়াবে না। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যে চাকরি পেয়েছেন, তিনি স্বাধীনভাবে ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, রাষ্ট্রের। যদি কেউ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সেবাদাসে পরিণত হন, তাহলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু অন্যায়ের দায় থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি চাই না। আগে যদি চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, তার বদলে নতুন করে আরেক দল চাঁদাবাজি করবে— এমন পরিবর্তন আমরা চাই না। পরিবর্তন মানে অন্যায়ের জায়গায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দল বদল নয়।

আমরা বিশ্বাস করি, এই দেশের মানুষই প্রকৃত শক্তি। যে বাংলাদেশে আইনের শাসন থাকবে, মেধার মূল্যায়ন হবে, সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে— সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।

এসময় পথসভায় আরো বক্তব্য রাখেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক যথাক্রমে- আলী আহসান জুনায়েদ ও সরোয়ার তুষার, জাতীয় নারী শক্তির সদস্য সচিব ডাক্তার মাহমুদা মিতু এমপি, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম এবং খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক প্রমুখ।