গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ চলাকালে বড় ধরনের অনিয়ম চোখে না পড়লেও ভোট গণনা, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রচারের মাঝামাঝি সময়েই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে খুলনা মহানগরীর হোটেল গ্রান্ড প্লাসিডে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, “ভোটের দিন পরিবেশ উৎসবমুখর ছিল। মানুষ জোয়ারের মতো ভোট দিয়েছে। কিন্তু পরে ফলাফল দেখে আমি দুঃখিত নই, বিস্মিত হয়েছি। এবারের ইঞ্জিনিয়ারিংটা হয়েছে আলাদা স্টাইলে। ভোটের সময় যাতে বোঝা না যায়। ভেটের পরে গণনা, বান্ডিল বাধা, রেজাল্ট শিট তৈরি করা এবং মিডিয়ায় ঘোষণা করার মাঝখানে দফায় দফায় সুযোগমতো, বিশেষ করে যেসব আসনে ১১ দলের প্রার্থীরা অল্প ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তাদেরকে ‘উপর’ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে হারিয়ে দেয়া হলো। রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আসন থেকে বিরোধী জোটের প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার খবর আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ফলাফল সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময়টাতেই কী রহস্যজনক ঘটনা ঘটানো হলো, সেটার জবাব সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন কেউই স্পষ্ট করে দিতে পারেনি।”
তিনি বলেন, ‘সরকার একটা আদালত ও নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়েছে এবং কয়েকটি আসনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা এটার ওপর নির্ভর করব না। তবে চাই জাতির সামনে আসল সত্য প্রকাশিত হোক।’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে দেশের মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া দেখা গেছে। অনেক মানুষ আছেন যারা কখনো জামায়াত করেননি, এমনকি দাঁড়িপাল্লার স্লোগানও দেননি, তারাও এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন।’
ভোটের দুই দিন আগে থেকে দেশে জামায়াতের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘বিএনপিসহ আমরা সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুঃখ নিয়ে আমাদের দেখতে হচ্ছে যে যারা জুলাই আন্দোলনের বেনেফিশিয়ারী বিএনপি সরকার গঠন করেছেন, আগামী ১২ তারিখে পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে, তার আগেই রাজনীতির যে নতুন ডাইমেনশ তারা তৈরি করেছেন তাতে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন কি করবেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’
তিনি বিএনপির এমপিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘এ রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আমাদের সন্তানরা যে রক্ত দিলো, তা বাদ দিয়ে তাহলে তারা কর্তৃত্ববাদী সরকারের দিকে হাঁটছেন বলে আমরা মনে করব। কর্তৃত্ববাদী সরকারের কি পরিণতি হয়, চব্বিশের আগস্ট বিপ্লব থেকে আমাদের সে শিক্ষা নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা সংবিধানের দোহাই দেন, ওই শপথ সংবিধানে নাই। সংবিধান নিয়ে এত বিতর্ক তুললে আপনারাই তো বিপদে পড়বেন। সংবিধানে তো এ নির্বাচন ছিল না, অন্তর্বর্তী সরকারও ছিল না।’
তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৮৪টি নানান সংস্কারের ব্যাপারে আমাদের সবার অঙ্গীকার রয়েছে। সেখানে এ অঙ্গীকারও করেছি যে সেগুলোর ব্যাপারে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইনডাইরেক্টলি আইনজীবী নিয়োগ করে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে বলে দিয়ে রিট দাখিল করা হয়েছে। আদালত থেকে তিনটি রুল জারি করা হয়েছে। ক্ষমতায় গেলে যদি মানুষের এত আত্মদান, এত রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা ভুলে যান, তাহলে জাতির সামনে কী দিন অপেক্ষা করছে আমরা জানি না।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খুলনা জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইনের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মুন্সী মিজানুর রহমানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মাহফিলে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম।
আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও হিন্দু মহাজোটের খুলনা জেলা সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি মো: রাশিদুল ইসলাম, সাংবাদিক এস এম হাবিব, খুলনা প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব রফিউল ইসলাম টুটুল, হেদায়েৎ হোসেন মোল্লা, কাজী শামীম আহমেদ।



