ভারত থেকে নিম্নমানের ভেনামি চিংড়ির নাপলি আমদানি করে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ন চিংড়ি হ্যাচারি খাতকে ধংসের নীল নকশায় মেতেছে অসাধু একটি সিন্ডিকেট। মৎস্য অধিদফতরের অসাধু কতিপয় কর্মকর্তা ও বিতর্কিত একটি সিন্ডিকেটের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে শ্রীম্প হ্যাচারী অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব)।
কক্সবাজারের কলাতলীতে সেব কার্যালয় সংলগ্ন মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিদ্যমান আইন ও সরকারি নীতিমালাকে কার্যত অগ্রাহ্য করে মৎস্য অধিদফতর ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নাপলি আমদানির অনুমতি দিয়েছে, এমন গুরুতর অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে মৎস্য ও চিংড়ি খাতে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনবহির্ভূতই নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে দেশীয় চিংড়ি হ্যাচারি শিল্প ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়ার শামিল।
হ্যাচারী মালিকরা বলেন, মৎস্য অধিদফতর গত ৩ ডিসেম্বর ৩৩.০২.০০০০.১২০.১০.০০১০.২৫.৮৩৭ নম্বর পত্রের মাধ্যমে সাতক্ষীরার দেবহাটার পুরুলিয়া বাজারের ‘তৌফিক এন্টারপ্রাইজ’-এর অনুকূলে ভারত থেকে ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নাপলি আমদানির অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৩ ডিসেম্বর ওই অনুমতির ভিত্তিতে আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। অনুমতি অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার ‘বিধা ফিশ ট্রেডার্স’-এর কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ নাপলি আমদানি করা হবে।
হ্যাচারী মালিকদের সংগঠন শ্রীম্প হ্যাচারী অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব) সভাপতি ও কক্সবাজার ৩ সংসদীয় আসনের সাবেক সাংসদ লুৎফর রহমান কাজল তার বক্তব্যে বলেন, ‘মৎস্য অধিদফতরের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ২০২৩ সালে প্রণীত ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন নীতিমালা এবং ‘মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০২৪’-এর চরম লঙ্ঘন। বিদ্যমান বিধিমালায় ভেনামি চিংড়ির ক্ষেত্রে কেবল ব্রুড, পিপিএল ও পিএল আমদানির বিধান থাকলেও নাপলি আমদানির কোনো আইনি সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, কোন আইনের ভিত্তিতে এই অনুমতি দেওয়া হলো?’
সেব মহাসচিব গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ভেনামি চিংড়ির পিএল উৎপাদনের জন্য মৎস্য অধিদফতরের অনুমোদিত ছয়টি হ্যাচারির কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব হ্যাচারি নিয়মিতভাবে ব্রুড ও পিপিএল আমদানি করে মানসম্মত পিএল উৎপাদন করছে এবং কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলক ভেনামি চাষে প্রয়োজনীয় পিএল সরবরাহ করে আসছে। এমন বাস্তবতায় আলাদাভাবে নাপলি বা পিএল আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
হ্যাচারি মালিকদের অভিযোগ, এ ধরনের অনুমতি অব্যাহত থাকলে দেশের চিংড়ি হ্যাচারি শিল্প কার্যত অচল হয়ে পড়বে। শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং এই শিল্পের সাথে যুক্ত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন। এতে একদিকে যেমন দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কাও করছেন তারা।
শুধু ভেনামি নয়, বাগদা ও গলদা চিংড়ির ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নাপলি ও পিএল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সেব এর অফিস সচিব এসএম বাবর বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মৎস্য অধিদফতর কর্তৃক যে পরিমাণ ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেয়া হয়েছে তাতে বছরে সর্বোচ্চ পোনা প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ২০ কোটি। আর যে ছয়টি হ্যাচারিকে ভেনামি পোনা উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি। তাই ভারত থেকে নাপলি আমদানীর প্রয়োজন নেই।’
এমতাবস্থায় এ খাত সংশ্লিষ্টরা চিংড়ির নাপলি আমদানির অনুমতি বাতিল, অন্যান্য অনুরূপ অনুমোদন প্রত্যাহার এবং মৎস্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



