বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই কৃষকের, শ্রমিক সঙ্কটে মাঠেই পচে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে পাট। নাটোরের লালপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হলেও তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো পাট কাটতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। এছাড়াও মাঠে পর্যাপ্ত পানি থাকায় জাগ দেয়ার জন্য পরিবেশ অনুকূলে থাকলেও শ্রমিকের অভাবে পাট কাটার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও পাটের গুণগত মান—দুই দিক থেকেই বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এই উপজেলায় আট হাজার ৬৬৫ হেক্টর জ্ঞমিতে পাটের চাষ হয়েছে। যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা সাত হাজার ৫৭০ হেক্টরের তুলনায় এক হাজার ৯৫ হেক্টর বেশি।
পাট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ এক হাজার কৃষকের মাঝে উন্নতমানের বীজ ও সার বিতরণ করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের তথ্যমতে, বর্তমান জমিতে বিঘাপ্রতি আট থেকে ১০ মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে ভালো মানের পাট প্রতিমণ তিন হাজার ৪০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা এবং নিম্নমানের পাট তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে বিঘাপ্রতি পাট বিক্রি থেকে আয় হতে পারে প্রায় ২৭ হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, সময়মতো পাট কাটতে পারলে বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫,০০০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে পাট কাটা না গেলে আঁশের মান নষ্ট হয়ে বাজারমূল্য কমে যায়। এতে বিঘাপ্রতি ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
উপজেলার আড়বাব ইউনিয়নের বড়বড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ ও সুমন বলেন, এবার পাটের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে সময়মতো কাটতে পারছি না। মজুরি বাড়িয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
চংধুপইল ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের কৃষক ফিরোজ আহম্মেদ জানান, পানি ভালো থাকায় জাগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পাট কাটতে দেরি হলে আঁশের মান খারাপ হয়ে যাবে, তখন দাম কমে যাবে।
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের মনিহারপুর গ্রামের পাটচাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এলাকায় অনেক শ্রমিক পাওয়া যেত। এখন অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছে বা বাইরে কাজ করছে। ফলে কৃষি কাজে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।’
দুয়ারিয়া ইউনিয়নের কলসনগর গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী ফরাজি বলেন, ‘সময় মতো পাট কাটতে না পারলে আমাদের বড় ক্ষতি হয় যাবে। অনেক টাকা খরচ করেছি, এখন লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে পাট ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান বলেন, ‘এ বছর পাটের বাজার মোটামুটি ভালো রয়েছে। কিন্তু মান ঠিক রাখতে না পারলে কৃষকরা ভালো দাম পাবেন না। সময়মতো কাটা ও জাগ দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার বলেন, ‘এ বছর পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক। তবে শ্রমিক সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে পাট কাটার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে পাটের ফলনও আশানুরূপ ভালো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘সময়ে পাট কাটা ও জাগ দেয়া সম্ভব হলে কৃষকরা ভালো দাম পাবেন এবং লাভবান হবেন।’



