আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর–বাসাইল) আসনে ক্রমেই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। হাট-বাজার, চায়ের দোকান কিংবা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে রাজনীতি। কে হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য এ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও লক্ষ করা যাচ্ছে বাড়তি আগ্রহ।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে এই আসনে রাজনৈতিক কৌতূহল অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনে এবারের নির্বাচনে দলটি অংশ নিচ্ছে না। ফলে নির্বাচনী সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন।
১৯৯১ সালের পর থেকে বিএনপি এ আসনে কোনো প্রার্থীকে সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী করতে পারেনি। দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো দলও জয় পায়নি। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার সেই ধারাবাহিকতা ভাঙার সুযোগ দেখছে বিএনপি। হারানো আসন পুনরুদ্ধারে দলটি ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছে।
এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হলেন- কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। তবে তাকে নিয়ে দলের ভেতরেই রয়েছে বিতর্ক ও অসন্তোষ। এর আগে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও তিনি বড় ব্যবধানে পরাজিত হন।
পাশাপাশি টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ককে হুমকি দেয়া, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বক্তব্য দেয়া এবং নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগসহ নানা ঘটনায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। এসব কারণে দলের একটি অংশের ক্ষোভ এখনো রয়ে গেছে।
তবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারলে এবার বিএনপির হারানো আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও এই আসনে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলটির প্রতি ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হলেন বাসাইল উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও টাঙ্গাইল জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মাওলানা শফিকুল ইসলাম খান। সখীপুর–বাসাইলে আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের ভোট একটি বড় ফ্যাক্টর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজস্ব ভোট ব্যাংকের বাইরে যে প্রার্থী এই ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবেন। সে ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের আস্থা অর্জন করাই জামায়াত প্রার্থীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে এই আসনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লাবীব গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
গত প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি সখীপুর ও বাসাইল উপজেলায় বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দিরসহ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা করে আসছেন। পাশাপাশি অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি এলাকায় একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
এ কারণেই তার প্রতি ভোটারদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। যদিও তার বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো ছাড়া দুই উপজেলায় ভোটের মাঠে জয়ী হওয়া তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে তার সমর্থক ও অনুসারীদের দাবি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আরো রয়েছেন সখীপুর উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মোহাম্মদ হাবিব।
প্রবীণ এই রাজনীতিক এলাকায় বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনের মাঠে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) থেকে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল হাসান রেজা।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির (কোদাল) মনোনয়ন নিয়ে মাঠে নেমেছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ও টাঙ্গাইল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আউয়াল মাহমুদ। তিনি গোটা নির্বাচনী এলাকা (সখীপুর-বাসাইল) সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে ভোটের মাঠে সরব রয়েছেন।
এদিকে কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি। সব মিলিয়ে টাঙ্গাইল-৮ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে দিন যতই গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। ভোটে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী বিজয়ের হাসি হাসবেন—সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো সখীপুর-বাসাইল।



