ঐতিহাসিক ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫০ বছরে পানির ন্যায্য হিস্যা না পেয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মারাত্মক পরিবেশগত ও কৃষি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তি ২০২৬ সালে শেষ হওয়ায়, নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ফেরানো এবং পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের দাবিতে ১৬ মে রাজশাহীতে বিশাল গণজমায়েত ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরের দিকে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্টুরেণ্টের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই আহ্বান জানায়।
এতে বক্তারা বলেন, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ ছিল বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গণজাগরণ। সেদিন লাখো মানুষ রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের উদ্দেশে পদযাত্রা করেছিলেন। কানসাটের সমাবেশে ভাসানী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না।’ একই সাথে ফারাক্কা বাঁধকে তিনি ‘মরণ ফাঁদ’ আখ্যা দেন। তার ওই বক্তব্যে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সমাবেশস্থল।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ওই লংমার্চের পর আন্তর্জাতিক পরিসরে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব তুলে ধরতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যার মাধ্যমে পানির প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশ ন্যূনতম ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের সমঝোতা স্মারকে সেই গ্যারান্টি ক্লজ বাদ দেয়া হয়।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার কারণে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নদী সংকুচিত হয়েছে, তলদেশ ভরাট হচ্ছে পলি ও বালুতে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে কয়েক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং পদ্মার ইলিশ প্রায় হারিয়ে গেছে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছেন লাখো মানুষ।
সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের একই দিনে তা নেমে আসে ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ কমে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক।
বক্তারা বলেন, ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে সেচ সঙ্কট তীব্র হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় সব গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আর্সেনিক দূষণও বাড়ছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমছে, হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। তাই এখনই নতুন চুক্তির জন্য প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। বক্তারা ১৯৭৭ সালের মতো গ্যারান্টি ক্লজ পুনর্বহাল এবং বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন যৌথ নদী কমিশন গঠনের দাবি জানান।
একই সাথে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানি সনদে বাংলাদেশের স্বাক্ষরের দাবিও জানানো হয়। বক্তাদের ভাষ্য, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দাবিরও আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে শনিবার (১৬ মে) বিকেল ৩টায় রাজশাহী নগরীর বড়কুঠী পদ্মাপাড়ে আয়োজিত গণজমায়েতে সর্বস্তরের মানুষকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট হোসেন আলী পিয়ারা, হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি, নদী গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী, ড্যাবের রাজশাহী সভাপতি ডা. ওয়াসিম হোসেন, তৌফিকুর রহমান লাবলুসহ সংশ্লিষ্টরা।



