মাদকের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত হাজী মাজার বস্তিতে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই পুনর্বাসনের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বস্তিবাসীরা।
বৃহস্পতিবার সকালে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বস্তি থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা।
মিছিলটি টঙ্গী বাজার ও স্টেশন রোড প্রদক্ষিণ করে ফ্লাইওভারের ওপর অবস্থান নেয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অবরোধে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এর আগে গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টঙ্গী বাজারের কলকারখানা অধিদফতর সংলগ্ন হাজী মাজার বস্তিতে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউকের উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. লিটন সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে পে-লোডার ও এক্সকাভেটর দিয়ে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জিএমপির বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
রাজউকের পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা তাদের নিজস্ব জমি উদ্ধারের জন্য এ অভিযান চালানো হয়েছে। রাজউকের উপপরিচালক মো. লিটন সরকার বলেন, প্রশাসনের সহায়তায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে তারা জমি বুঝে নিয়েছেন। উচ্ছেদ করা জমিতে যাতে ফের দখল বা মাদকের আস্তানা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হাজী মাজার বস্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে অভিযান চালালেও মাদক কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিক্ষোভকারী বস্তিবাসীদের অভিযোগ, গুটিকয়েক মাদক ব্যবসায়ীর অপকর্মের দায় সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর চাপিয়ে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।
তারা বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হোক, প্রকৃত কারবারিদের গ্রেফতার করা হোক—এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। বরং তাদের ধরতে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। কিন্তু মাদক কারবারিদের সঙ্গে সাধারণ বস্তিবাসীদের এক করে কোনো ধরনের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মেনে নেওয়া যায় না।’
বিক্ষোভকারীরা দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানান। স্থায়ী ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অন্তত বর্তমান এলাকায় তাদের বসবাসের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান তারা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে নারী, শিশু ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
মাদকের আড়ালে লোককথার স্মৃতিও
বর্তমানের মাদককেন্দ্রিক পরিচয়ের পাশাপাশি হাজী মাজার বস্তি ঘিরে রয়েছে পুরোনো লোককথা ও পুঁথি সাহিত্যের স্মৃতি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, এ এলাকায় কথিত সোনাভানের মাজার ও ‘সোনাভানের পুকুর’ রয়েছে। পুঁথির গল্পে বর্ণিত সোনাভানের সঙ্গে এ এলাকার সম্পর্ক রয়েছে—এমন বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।
বস্তির পাশের তুরাগ নদের অংশটিকেও পুঁথি সাহিত্যে বর্ণিত ‘কহর দরিয়া’ নামে অভিহিত করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। এসব তথ্যের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষণার সুযোগ থাকলেও লোকমুখে প্রচলিত এসব কাহিনি এলাকাটির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে।
শিল্পাঞ্চলের পতিত জমিতে বস্তি
টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির বর্তমান সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পনগরী টঙ্গীর পুরোনো ভূমি ইতিহাসও। ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার টঙ্গীতে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে তুরাগ নদের উত্তর পাড় থেকে আউচপাড়া পর্যন্ত সাতটি মৌজার জমি অধিগ্রহণ করে। পরে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে প্লট আকারে এসব জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।
কিন্তু অনেক প্লটে দীর্ঘদিনেও শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠায় সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে বিভিন্ন সময়ে ওইসব পতিত জমিতে গড়ে ওঠে বস্তি। স্থানীয়দের হিসাবে, টঙ্গীর প্রায় ১৯টি বস্তির অধিকাংশই রাজউকের শিল্পাঞ্চলের পতিত বা অব্যবহৃত জমিতে গড়ে উঠেছে। তুরাগ তীরঘেঁষা হাজী মাজার বস্তিও এর অন্যতম।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত পুরোনো এ বস্তিতে প্রায় আড়াই হাজার ভোটার রয়েছেন বলে জানা গেছে। বস্তিটির পাশেই রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। টঙ্গীর ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে শিল্পাঞ্চলের হোন্ডা রোডের (এটলাস হোন্ডা কারখানা) উত্তর দিক থেকে তুরাগ নদের তীরের বেদেপট্টি পর্যন্ত বিস্তৃত এ বস্তি।
বস্তিটির পাশেই রয়েছে সুবিশাল ইজতেমা মাঠ। একসময় এটিও সাবেক ডিআইটি তথা বর্তমান রাজউকের শিল্পাঞ্চলের জমির অংশ ছিল।
উচ্ছেদের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—রাজউকের জমি দখলমুক্ত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব কে নেবে? বস্তিবাসীরা বলছেন, সরকারি জমি উদ্ধার ও মাদক নির্মূলের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ যেন নতুন সংকট তৈরি না করে, সে বিষয়েও সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ চান তারা।



