মা ময়না বেগম

শহীদ সাজ্জাদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে মায়ের কাছে বিকাশে ১ হাজার টাকা নিয়েছিলেন

“মধুর সুরে ডাকতেছে। ডাক শোনার পর বললাল কি হইছে বাবা। এতো মা মা করে ডাকতেছো কেন বাবা। তখন সে বলে মা আমার তো এক হাজার টাকা লাগবে।”

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো
নয়া দিগন্ত প্রতিনিধিকে ছেলের ছবি দেখাচ্ছেন মা ময়না বেগম
নয়া দিগন্ত প্রতিনিধিকে ছেলের ছবি দেখাচ্ছেন মা ময়না বেগম |নয়া দিগন্ত

গত বছর ১৯ জুলাই নিহত সবজি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে অন্তত ১০-১২ বার মা মা ডেকে বিকাশে এক হাজার টাকা বিকাশে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার মা ময়না বেগম।

শনিবার (১৯ জুলাই) তার শাহাদতের দিনে নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে এ কথা জানান তিনি।

ময়না বেগম বলেন, ‘আন্দোলনে যাওয়ার সময় আমার ছেলে আমাকে ফোন দিছিলো। তখন আমি মেয়ের বাসায় ছিলাম। ছেলে ফোন দিয়ে বলে মা কি খাইছো। কি করতেছো। তখন আমি বলি ডিম ভুনা দিয়ে খাইছি। তখন ছেলে আবারও বলে মা খাইছো। নাকি এমনিতে বলতেছো। তখন আমি বলি বাবা খাইছি। তখন শুধু বারে বারে মা মা করে কইতেছে। মা মা এরকম ১০ থেকে বারো মা মা বলে ডাকতেছে। মধুর সুরে ডাকতেছে। ডাক শোনার পর বললাল কি হইছে বাবা। এতো মা মা করে ডাকতেছো কেন বাবা। তখন সে বলে মা আমার তো এক হাজার টাকা লাগবে। তখন আমি বলি বাবা ৫ মিনিট দেরি করো আমি দিতেছি। তারপরে মোবাইলের দোকানে গিয়ে ১ হাজার টাকা ছেলেকে দিলাম। পরে আবার ফোন দিয়ে আমাকে বলে মা লাস্টের নাম্বার কতো। ততক্ষণে আমি দোকান থেকে মেয়ের বাসায় এসেছি। আমি বললাম। বাবা আমি আর দোকানে যাইতে পারবো না। তখন বললো কত দিছো। আমি বললাম ১ হাজার দিছি। তখন বললো ঠিক আছে। এই পর্যন্তই ছিল ছেলের সাথে শেষ কথা। আর কথা বলতে পারি নাই।’

মৃত্যুর খবর শোনার বিষয়ে ময়না বেগম বলেন, ‘ওই দিন সাড়ে ৫টার সময় আমার বড় মেয়ে জামাই ফোনে বলতেছে মা বাড়িত কি হইছে। কিছু কি শুনছেন। আমি বলি না তো বাবা কিছু শুনি নাই। তখন বলতেছে। সাজ্জাদ যে মিছিলে যায়া গুলি খায়া মারা গেইছে । শোনামাত্রই আমি মাথা ঘুরে মেয়ের বাসায় পড়ে যাই। সাথে সাথে বউ মা ফোন দিছে। বলতেছে আম্মু কি করতেছো। আমি বলি আমি বন্যার বাসায়। তখন বউ মা তার বাপের বাড়িতে বিয়ে খাইতে গেছিল। তখন বউ মা আমাকে বলে সাজ্জাদ মারা গেইছে। আমি এখন কই যাবো। কার কাছে যাবো। এই কথা শুনে আমি পড়ে গেছি। আমার একটা দাত আর পায়ের নখ উপরে গেলো। আমি তো দূরে ছিলাম। গাড়ি পাই নাই। আসতেও পারি নাই। তারাতারি করে আমার ছেলেকে মিস্ত্রিপাড়া কবরস্থানে মাটি দেয়। আমি আমার ছেলের লাশও দেখতে পাই নাই।’

সেদিনের ঘটনার বর্ননা দিয়ে মা ময়না বেগম বলেন, ‘আজ এক বছুর পুর্ণ হলো আমার ছেলে শহীদ হওয়ার। মিছিলে রুটিকলা দিতে গিয়েই গুলিতে খুন হয় আমার ছেলে। আমি শেখ হাসিনার বিচার চাই। অন্যান্য দোষি যারা আছে। তাদের সবার বিচার চাই। আমি শুনছি ৪/৫ জন গ্রেফতার হয়েছে। অনেকেই বাহিরে আছে। তাদেরকে ধরা হচ্ছে না। একবছরে মাত্র এই কয়জন গ্রেফতার হলো। এতে আমি খুব হতাশ।’

সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন খুনের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৫১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৩০০ জনকে আসামি করে গত বছর ২০ আগস্ট আদালতে হত্যা মামলা করেন স্ত্রী জিতু বেগম। মামলায় অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব নাঈমুল ইসলাম খান, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী এ আরাফাত, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সুভাষ সিংহ রায়, সাবেক সংসদ সদস্য অপু উকিল, সাবেক সংসদ সদস্য জাকির হোসেন সরকার, সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান বাবলু, সাবেক সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক, বদরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র টুটুল চৌধুরী, গংগাচড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার উত্তম কুমার পাল, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার উৎপল রায়, পরশুরাম জোনের সহকারী কমিশনার ইমরান, কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান আরিফ, কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর নিতাই রায়, শ্রমিক লীগ সভাপতি আব্দুল মজিদ, রংপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি লক্ষ্মীন চন্দ্র দাস, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক পিপি খন্দকার রফিক হাসনাইন, রংপুর জজ কোর্টের পিপি আব্দুল মালেক, আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হক প্রামানিক।

সাজ্জাদ হোসেনের ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন হওয়ায় আদালতের আদেশে গত বছর ২ সেপ্টেম্বর মিস্ত্রিপাড়া কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন শেষে ময়না তদন্ত করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।

গত বছর ১৬ জুলাই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক উচিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আবু সাঈদ হত্যার দু'দিন পর ১৮ জুলাই রংপুরের মডার্ন মোড়ে আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত হন অটোচালক মানিক মিয়া। পরে আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। ১৯ জুলাই ২০২৪। সিটি বাজারের সামনে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে বাঁধা দেয় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। শুরু হয় নির্বিচারে গুলি। প্রাণ হারান কলা ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম বৌরানী জুয়েলার্সের ম্যানেজার মুসলিম উদ্দিন মিলন, সবজি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ ও শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির। গুলিবিদ্ধ হন অসংখ্য মানুষ।