দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, বৈরি আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের ধান গবেষণায় বৈচিত্র আনতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত দু’টি হাইব্রিডসহ আরো ছয়টি নতুন ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় সারা দেশজুড়ে চাষাবাদের জন্য এ ধান অবমুক্ত করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্রি মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নতুন ছয়টি জাত যুক্ত হওয়ায় ব্রি উদ্ভাবিত মোট ধানের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২৭টিতে।
ধান গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, এই ছয়টি জাতের মধ্যে রয়েছে, ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ কালো চালের জাত, লবণাক্ততা সহনশীল ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত, হাওরাঞ্চলের উপযোগী ঠাণ্ডা সহনশীল জাত, উচ্চ ফলনশীল নাবী বোরো জাত এবং দু’টি লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী হাইব্রিড ধান।
ব্রি ধান১১৫ পুষ্টিসমৃদ্ধ কালো চালের নতুন জাত। এটি ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ জাত। এটি বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত যা এন্থার কালচার পদ্ধতি ব্যবহার করে উদ্ভাবন করা হয়। এ জাতের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৪ টন এবং জীবনকাল ১৩৭-১৪২ দিন। পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০০ সে:মি:। ধান লম্বা ও চিকন। ধান কালচে বাদামী রঙের এবং ধানের দানার রং কালো। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম। এ ধানের অ্যামাইলোজ ২৩%। ধানের দানায় ভিটামিন ই এবং সায়ানিডিন-৩- গ্লুকোসাইডের (ঈ৩এ) পরিমাণ যথাক্রমে ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ২৯.১২ মিলিগ্রাম/কেজি। এছাড়াও ধানের দানায় প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৩৬.৬১ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান। ব্রি ধান১১৫ বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত।
ব্রি ধান ১১৬ উচ্চ ফলনশীল ও শক্ত কাঠামোর জাত। এ ধান বোরো মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল একটি নাবী জাত। ব্রি ধান১১৬ জাতটি ব্রি ধান৯২ এর সমসাময়িক একটি দীর্ঘ জীবনকালের জাত। গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। এ জাতের চালের আকার আকৃতি মাঝারি চিকন এবং ব্রিধান৯২ এর চালের চেয়ে সরু। গাছ শক্ত এবং মজবুত বিধায় এ জাতটি সহজে হেলে পড়ে না। এর ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা বিধায় ধানের শীষ উপর থেকে দেখা যায় না। ধান পাকলেও এর পাতা সবুজ থাকে। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে ব্রি ধান৯২ এর চেয়ে প্রায় ১৩.৭৫% বেশি ফলন দিয়েছে। এ জাতের হেক্টরে গড় ফলন ৮.৫৯ টন। উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে এ জাতটি হেক্টরে ১০.৩৬ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এর চাষাবাদ পদ্ধতি ব্রি ধান৯২ এর অনুরুপ বিধায় এটি বিকল্প হিসেবে আবাদ করা যাবে। ব্রি ধান১১৬ একটি নাবী বোরো জাত, যা ব্রি ধান৯২-এর সমসাময়িক হলেও অধিক ফলনশীল।
ব্রি ধান১১৭ লবণাক্ততা সহনশীল ও রোগ প্রতিরোধী জাত। এ ধান বোরো মওসুমের স্বল্প জীবনকালীন লবণাক্ততা সহনশীল ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত। এ জাতের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৮.৬ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এর ফলন হেক্টর প্রতি ৯.৯০ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা মাঝারি মোটা এবং সোনালী বর্ণের। এ জাতের জীবনকাল ১২৯-১৩৫ দিন (গড় জীবনকাল ১২৯ দিন), যা বোরো মওসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ এর সমান জীবনকাল। ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৪.২ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.৩ ভাগ। ভাত ঝরঝরে। জাতটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লবণাক্ততা সহনশীলতা ছাড়াও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী এবং আর্টিফিশিয়াল ইনোকুলেশনে উচ্চ মাত্রার ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী (স্কোর-০-৩) ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। উপকূলীয় ও লবণাক্ত এলাকাগুলোর জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় জাত।
ব্রি ধান১১৮ হাওরের জন্য বিশেষ জাত, হাওরাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা ও ঠাণ্ডার ঝুঁকি মোকাবিলায় এই জাতটি বিশেষভাবে তৈরি। এ জাতটি প্রজনন পর্যায়ে ঠাণ্ডা সহনশীল হওয়ায় হাওরে আকস্মিক বন্যায় আধাপাকা থকে পাকা পর্যায়ে ধান ডুবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এ জাতটি আগাম বপন (২৫ অক্টোবর-১ নভেম্বর) করলেও ধান চিটা হবে না এবং কমপক্ষে ৬.০ টন/হে ফলন দিতে সক্ষম, তবে স্বাভাবিক সময়ে অর্থাৎ ১৫-২০ নভেম্বর বপনে ১৪৫ দিনে ৬.৯-৮.৫ টন/হে পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এ ধানের চালের আকার আকৃতি মাঝারি মোটা। ভাত ঝরঝরে এবং সাদা। এ ধানের চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৮.৩ ভাগ। এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.১ ভাগ। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে ব্রি ধান২৮ এর চেয়ে প্রায় ২২.৮৩% বেশি ফলন দিয়েছে।
ব্রি হাইব্রিড ধান৯ লবণাক্ততা সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল। জাতটি লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী এবং মাঝারী মাত্রায় লবণাক্ততা সহনশীল। এটি চারা থেকে পরিপক্ক অবস্থা পর্যন্ত ৪-৮ ডিএস/মি: মাত্রায় লবনাক্ততা সহ্য করতে পারে। এর দানার আকৃতি মাঝারী ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৬%। এক হাজার দানার ওজন ২৫.৫ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমান ৯.৩%। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৫-১০.৫ টন/হে। উপকূলীয় অঞ্চলে ফলন ৬.৫-৭ টন/হে।
ব্রি হাইব্রিড ধান ১০ ঢলে পড়া প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল জাত। এ ধানের দানার আকৃতি চিকন ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৫%। এক হাজার দানার ওজন ২৩.৭ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমান ৯.১%। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৭-১০.৭ টন/হে.।
সভায় জানানো হয়, নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোসহ ব্রির ৩৯টি জাত রয়েছে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন বৈরি পরিবেশ সহনশীল। ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কৃষকের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছানোর ফলেই বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। যেখানে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ, এখন তা ১০শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে লোকসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এটি বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার বড় সাফল্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



