ঢাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহতের সরকারি সংখ্যা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। এমনকি ঘটনার দিনে এবং তার পরেও ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় থেকে অনেকে দলবদ্ধ হয়ে সেখানে খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চড়াও হয়েছেন।
অভিযোগ ছিল, গণমাধ্যমে আহত-নিহতের সংখ্যা কম করে দেখানো হচ্ছে।
তবে ঘটনাটিকে ঘিরে হতাহতের ভুল তথ্য, ভুয়া অনেক খবরও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে; যা মানুষের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয় এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে বলেও অভিযোগ ওঠে।
যদিও এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার জন্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
কিন্তু পরিস্থিতিটা গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এক ধরনের চাপে ফেলে। অতীতেও বড় কোনো দুর্ঘটনা দুর্যোগে হতাহতের সঠিক সংখ্যা তুলে ধরতে গিয়ে জাটিলতায় পড়তে হতো।
এবার চাপের মাত্রাটা ছিল ভিন্ন রকম। বিমান দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজের সরাসরি খবর সংগ্রহে থাকা সাংবাদিকদের অনেকে বলেছেন, টেলিভিশনে সরাসরি সংবাদ প্রচারের সময়ও ভিড় করা লোকেদের অনেকে দলবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়েছেন।
সামাজিকমাধ্যমে ভুল তথ্য, ভুয়া খবর বা গুজব প্রচলিত গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঠিক খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, এই প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্থলে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দলবদ্ধ চাপের মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন একজন সাংবাদিক।
বেসরকারি যমুনা টেলিভিশনের ওই সাংবাদিক আল আমিন হক লিখেছেন, ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে দুর্ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি কিছু বিক্ষুব্ধ তরুণদের কাছে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পরে তিনি আরো অনেক সহকর্মীকে ওখানে হেনস্তার শিকার হতে দেখেছেন।
আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম সরাসরি সম্প্রচারকালেই বিক্ষুব্ধ লোকজনের চাপের মুখে পড়েন। নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে না বললে তাকে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করতে দেয়া হবে না, এই কথা বলে তাকে সেখানে বাধা দেন এক দল তরুণ।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘যখন আমি সরাসরি সম্প্রচারে যাই, ওই সময় আমার চারদিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঘিরে ফেলে। তারা বলছিল যে আপনারা কেন এখানে সরাসরি সম্প্রচার করছেন? আপনারা এখান থেকে বের হয়ে যান, অন্যথায় আপনাদের প্রকৃত সংখ্যাটা প্রকাশ করতে হবে। তা না হলেও আপনারা এখানে থাকতে পারবেন না।’
একই পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম সবুজও।
মাইলস্টোন স্কুলের মাঠে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকরা ‘মিথ্যা’ তথ্য দিচ্ছে অভিযোগ তুলে বিক্ষুব্ধ তরুণরা শফিকুল ইসলামকে নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলতে চাপ দেন।
তিনি বলেন, এই ধরনের হতাহতের ঘটনায়, এমন চাপ তৈরির চেষ্টা নতুন নয়, আগেও তার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু এবার শারীরিকভাবেও হেনস্তার চেষ্টা করা হয় বলে জানান।
শফিকুল বলেন, ‘আমাকে বলা হচ্ছিল যে সাংবাদিকরা মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন, মৃত্যু সংখ্যা অনেক, কিন্তু সাংবাদিকরা বলছেন ২০-৩০ জন।’
ওই সাংবাদিক বলেন, এমন চাপ তৈরির ঘটনা অতীতেও ছিল, কিন্তু সাংবাদিকদের গায়ে হাত দেয়া, সংবাদ প্রচার না করতে দেয়ার মতো ঘটনা আগে ঘটতো না।
‘মানুষ যেহেতু তথ্য পায়নি, তাই দ্রুত গুজব ছড়ায়’
গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের সময় ঢাকায় উত্তরার স্কুলটিতে বিধ্বস্ত হয়ে শিশুদের হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সেই ঘটনার পর হেলিকপ্টারে করে গুরুতর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়। সে সময় ঘটনাস্থলে উৎসুক অনেক মানুষ ভিড় করে। তাদের অনেকে আবার স্বেচ্ছ্বাসেবক হিসেবে উদ্ধার কাজেও যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে মানুষের ভিড়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ।
সেই মানুষের ভিড়ে মুখে মুখে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে হেলিকপ্টারে করে লাশ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
হেলিকপ্টার ও অ্যাম্বুলেন্সসহ উদ্ধার তৎপরতার নানা রকম ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেসব ভিডিও ও ছবির সাথে আহত-নিহতের ভুল পরিসংখ্যান ও ভুয়া অনেক তথ্যও ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যমে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরাও ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশসহ ছয় দফা দাবিতে ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ মিছিল করে। এসময় তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রেস সচিবকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, সরকার দুর্ঘটনার পর হতাহতের ঘটনায় আহত বা নিহতের সংখ্যাটা প্রকাশ করতে দেরি করেছে, ফলে মানুষ যেহেতু তথ্য পায়নি, তাই দ্রুত গুজব ছড়াতে থাকে।
তার মতে, ‘যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক ভাষ্যটা আসতে দেরি হয়, ফলে মানুষের মাঝে গুজবটা ছড়িয়ে পড়ে। গুজবের ডালপালা ছড়াতে থাকে।’
‘যদি সাম্প্রতিক দু’টি ভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করি, একটা হচ্ছে গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সহিংসতা, আরেকটা হচ্ছে মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা।’
‘এই দু’টি ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের কৌশলগত এবং ব্যবস্থাপনাগত কিছু ত্রুটি ছিল। যেমন- একবার একটা স্ট্যাটাস দিচ্ছে আবার তা মুছে দিচ্ছে। আবার দু’টি সংস্থা যেমন আইএসপিআর বলছে নিহত ৩১ জন, অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে ২৯ জন। নিহতের সংখ্যা তো দুই রকম হতে পারে না’ বলে উল্লেখ করেন সাইফুল আলম।
সরকারি তথ্যের এমন গড়মিলের কারণে দ্বিধায় পড়তে হয় গণমাধ্যমকেও। কারণ নির্ভরযোগ্য তথ্যের স্বল্পতার কারণে গণমাধ্যমগুলোতেও আহত বা নিহতের সংখ্যার পার্থক্য দেখা যায়, যা পাঠক বা দর্শকদের বিভ্রান্ত করে এবং তৈরি করে সন্দেহ।
যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক ভাষ্যটা আসতে দেরি হয় ফলে মানুষের মাঝে গুজবটা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, তথ্যের গড়মিলের কারণে অস্পষ্টতা তৈরি হয়, যা গুজবের ডালপালা ছড়াতে সাহায্য করে। তখন তারা আর গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করতে পারে না।
তিনি মনে করেন, তথ্যের গড়মিল যখন হয় এবং তথ্যের অস্পষ্টতা থাকে, তখন গুজবগুলো ছড়ায়। এবং লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, যারা সংবাদ দিচ্ছে তারা ভুয়া সংবাদ দিচ্ছে।
‘এর মধ্যে আবার রাজনৈতিক কোনো দলের নেতা যদি বলে ফেলেন যে নিহতের সংখ্যা এতো ছাড়িয়ে যাবে, তখন গুজবকে আরো জোরালো করে। এসব রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিকমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন অপতথ্য দেয়, তখন মানুষের ওই তথ্যের উৎস বা নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না। ফলে সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়’ বলে উল্লেখ করেন শরিফ।
মাইলস্টোন স্কুলে হতাহতের ঘটনায় সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পরিসংখ্যান বা গুজবের ব্যাপারে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরকে বিবৃতি দিতে হয়। তাতে বলা হয়, তারা নিহতের সংখ্যা গোপন করছে না। চাইলে যে কেউ এই নিয়ে তদন্ত করতে পারে এবং তারা সহযোগিতা করবে।
‘সংবাদ নিজের দৃষ্টিকোণের বিপরীতে হলেই ট্যাগিং’
আগেও বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে আহত বা নিহতের সংখ্যা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব বা চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে গণমাধ্যমকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘দিনাজপুরের কয়লা খনি, তাজরিন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ড, এ ধরনের ঘটনায় আপনি দেখবেন, যে যুগে ফেসবুক ছিল না, সে যুগেও সাংবাদিকদের ওপর এমন চাপ তৈরি করা হতো। নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলতে হবে বা সাংবাদিকরা নিহতের সংখ্যা গোপন করছেন। আগে ছড়াতো এলাকায় আর এখন ছড়াচ্ছে সারা বিশ্বজুড়ে।’
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নিজের মতাদর্শ বা দৃষ্টিকোণের বাইরে গেলেই যেকোনো সংবাদের সমালোচনা করার প্রবণতা বেড়েছে।
সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, “কোনো সংবাদ নিজের দৃষ্টিকোণের বিপরীতে হলেই ওই গণমাধ্যমকে ‘ট্যাগিং’ করার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।”
তবে, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত এবং নির্ভরযোগ্য অনেক গণমাধ্যম থাকার পরেও তরুণ প্রজন্ম তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তারা যাচাই করা তথ্য বাদ দিয়ে সামাজিক মাধ্যমের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করে।
তবে এর পেছনে বেশ কিছু কারণও আছে বলে মনে করেন সাজ্জাদ শরিফ।
‘আমাদের দেশে যেহেতু গণমাধ্যম দীর্ঘদিন একটা চাপের মধ্যে ছিল এবং সত্যি কথা বলতে পারেনি। যারা দেশের বাইরে ছিল, আমাদের কতৃত্ববাদী সরকারের আওতার বাইরে ছিল, তারা অনেক কথা বলেছে যার মধ্যে অনেক কিছু সত্য ছিলো, অনেক কিছু ছিলো না। যা তখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম বলতে পারেনি। এটা সত্যি কথা। ফলে সামাজিকমাধ্যমের একটা গুরুত্ব ওই সময়ে বেড়েছে।’
সাজ্জাদ শরিফ বলেন, এখন বাংলাদেশে সংবাদ প্রকাশে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন চাপ না থাকলেও, বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চাপ তৈরির চেষ্টা করে। বিশেষ করে কোনো সংবাদ তার দৃষ্টিকোণের বিপরীতে গেলেই ক্ষিপ্ত হয়ে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করে। ফলে পরিবেশটা সাংবাদিকদের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে বলে মনে করেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি



