ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে সারাদেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গত বছর ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ১ হাজার ৩৪০ জন আহত হয়েছেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে বৃষ্টির কারণে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে। পাশাপাশি ভাঙাচোরা সড়ক, অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং চালকদের আইন অমান্যের প্রবণতাও দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
সংগঠনটির দাবি, চালক সঙ্কটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালক দিয়ে বিরামহীনভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কিছু পরিবহন মালিক মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ বাস মেরামত ছাড়াই ঈদযাত্রায় নামানোয় যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাল-বিল ও রাস্তার পাশে পড়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বরাবরের মতো এবারো দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ঈদযাত্রার ১৫ দিনে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত ও ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের মধ্যে ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক, তিনজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং চারজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ কার ও মাইক্রোবাস, ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিল।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কার ঘটনা, ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ১ দশমিক ৫২ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ এবং ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
এছাড়া মোট দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ ফিডার সড়কে, ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১ দশমিক ৫২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর দুই ঈদে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেন। এই যাত্রা নিরাপদ করতে ঈদকেন্দ্রিক স্বল্পমেয়াদি তৎপরতার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে নিরাপত্তা করিডোর গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সূত্র : ইউএনবি



