বর্তমানের পুঁজিবাদী উন্নয়ন ধারা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে এবং প্রকৃতির সাথে শত্রুতা তৈরি করছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, এই ধারা পরিবর্তন করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে ‘ইপসা-সমধারা দ্বাদশ কবিতা উৎসব-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'রাজনীতি ও অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও পরিচয় হলো তার সংস্কৃতি। সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি টিকে থাকে। ৩০০০ বছর আগে প্যাপিরাসে লেখা হোমারের কবিতা আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান থাকা তার বড় প্রমাণ।'
‘কবিতাই পারে- এ শ্লোগানকে সামনে রেখে সাহিত্য বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘সমধারার উদ্যোগে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রয়াত কবি সরোজ দেবকে উৎসর্গকৃত দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিসরে এ কবিতা উৎসবে ২শত জন অগ্রজ ও অনুজ কবি-লেখক উপস্থিত ছিলেন।
কবি প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমদ দুলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হারুন হাবীব। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কবি-প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ, কবি নজমুর হেলাল, শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ প্রমুখ। তিন পর্বের উৎসব পরিচালনা করেন সমধারা সম্পাদক ও প্রকাশক সালেক নাছির উদ্দিন।
প্রথম পর্বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কবির স্বকণ্ঠে স্বরচিত কবিতা পাঠ; আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি শিরোনামে ২০ জন কবিতা পাঠ করেন।
দেশের অন্যতম সাহিত্য বিষয়ক কাগজ সমধারা প্রতিবছর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় গুণীদের পুরস্কার প্রদান করে আসছে। দ্বিতীয় পর্বের আয়োজনে সমধারা সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬ গ্রহণ করেছেন কথাসাহিত্যে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামাল, কবিতাসাহিত্যে কবি আদ্যনাথ ঘোষ এবং শিশুসাহিত্যে বিজ্ঞানী ও প্রবাসী ছড়াকার ধনঞ্জয় সাহা। ধনঞ্জয় সাহার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নগদ অর্থ, পোর্ট্রেট এবং উত্তরীয় প্রদান করা হয়েছে।
সমধারা কথাসাহিত্যে পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি পুরস্কারের জন্য লিখি না। একটা ভালো উপন্যাস বা গল্প লিখতে পারা এবং সেটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোকেই আমি বড় পুরস্কার মনে করি। যখন আনন্দ পাবলিশার্স কিংবা লন্ডনের অলিম্পিয়া পাবলিশার্স থেকে আমার বই বের হয়, সেটিই আমার কাছে বড় অনুপ্রেরণা।’
দেশের পুরস্কার বিতরণী ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক সময় পুরস্কার রাজনৈতিকভাবে কলুষিত বা সমালোচিত হয়। অনেক সত্যিকারের লেখক পুরস্কারের ধারে-কাছেও যান না। আবার দেখা যায়, অল্প লিখেও অনেকে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন।’
কালজয়ী লেখকদের উদাহরণ টেনে তিনি আরো বলেন, ‘জীবনানন্দ দাশকে আমরা ১০০ বছর পর মূল্যায়ন করতে পেরেছি। নজরুল বা রবীন্দ্রনাথও তাদের সময়ে নানাভাবে সমালোচিত ও অপদস্থ হয়েছেন। কিন্তু কাজই তাদের টিকিয়ে রেখেছে। সত্যিকারের মূল্যায়ন এভাবেই হয়।’
তৃতীয় পর্বে উৎসবে বিশেষ আকর্ষণ কথাসাহিত্যে পুরস্কারপ্রাপ্ত মোস্তফা কামালের পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘দেবো খোঁপায় তারার ফুল’ অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য ‘প্রেমার্ঘ্য নৈবেদ্য। গ্রন্থনা ও রচনা করেছেন ফরিদ আহমদ দুলাল। নির্দেশনায় ছিলেন সালেক নাছির উদ্দিন। এতে সমধারা পরিবারের ২৫ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেন।
শিল্প-সাহিত্যে সমধারা সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি সেতু বন্ধন তৈরি করতে কাজ করছে। নিয়মিত বিষয় ভিত্তিক সংখ্যার পাশাপাশি সমধারা কবিতা উৎসব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সক্রিয় প্লাটফর্ম। এ উৎসব কবি, লেখকদের জন্য বাৎসরিক মিলনমেলা। এতে করে নতুন প্রতিভাদের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
‘সমধারা’ নিয়মিত প্রকাশনার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা, অবহেলিত শিশুদের স্বাক্ষরজ্ঞানসহ সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় একুশ শতকের কবিদের মূল্যায়ন করার লক্ষ্যে সমধারা কবিতা উৎসবের আয়োজন করছে। পাশাপাশি খ্যতিমানদেরও সম্মান জানিয়ে আসছে।
২০২৫ সালে চার প্রবাসী মুহাম্মদ ইকবাল, শামীম আহমদ, আজিজুল আম্বিয়া ও সেলিম রেজাকে পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে কথাসাহিত্যে বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কবিতাসাহিত্যে মজিদ মাহমুদ ও শিশুসাহিত্যে ধ্রুব এষ পুরস্কার গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালে কথাসাহিত্যে হরিশংকর জলদাস, কবিতায় ফরিদ আহমদ দুলাল ও শিশুসাহিত্যে স ম শামসুল আলম; ২০২২ সালে পুরস্কার গ্রহণ করেন কথাসাহিত্যে আনোয়ারা সৈয়দ হক ও কবিতায় ওমর কায়সার। ২০২১ সালে কথাসাহিত্যে ইমদাদুল হক মিলন এবং কবিতায় সরোজ দেব; ২০২০ সালে কথাসাহিত্যে সেলিনা হোসেন এবং শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ। ২০১৯ সালে কবি মৃণাল বসুচৌধুরী, ২০১৮ সালে মুহম্মদ নূরুল হুদা, ২০১৭ সালে নির্মলেন্দু গুণ এবং ২০১৬ সালে হেলাল হাফিজ এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে সমধারা সাহিত্য পুরস্কার ২০২৭ এবং ২০২৮ সালের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সংস্কৃতিকর্মীরাই পারে মানুষের কল্যাণ চিন্তায় স্রোতের বিপরীতে উজানে চলতে। শুভ চেতনার পক্ষে সবাই সক্রিয় থাকতে চাই নিরন্তর। সমধারা সে কাজটিও করে যাচ্ছে নিষ্ঠার সঙ্গে। স্বপ্ন-বাস্তবতার ক্ষেত্রে সমধারা হয়তো সবার প্রত্যাশা সমভাবে পূরণ করতে পারছে না; কিন্তু তাদের আন্তরিকতায় যে সামান্য ঘাটতি নেই সে কথা স্পষ্ট হয় সমধারার নানা আয়োজনে। আগামীতে সমধারার সৃষ্টিশীল কর্মে সকলের সহযোগীতা প্রত্যাশা করেছেন সমধারা কর্তৃপক্ষ।



