‘কোথায় স্বর্গ/কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর/মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক/মানুষেতে সুরাসুর’ —কালজয়ী কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজো চরম অবহেলা আর অযত্নে অবলুপ্তির পথে। যার লেখনী যুগের পর যুগ মানুষকে মানবতার শিক্ষা দিয়েছে।
জানা গেছে, ১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন রংপুর জেলার (বর্তমানে লালমনিরহাট) কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক কাকিনায় জন্ম নেন কবি শেখ ফজলল করিম। তার বাবা আমীর উল্লাহ সরদার ছিলেন কাকিনা মহারাজার বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। মা কোকিলা বিবি। কাকিনা মিডল ইংলিশ স্কুল (বর্তমানে কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়) ও রংপুর জেলা স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়নি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দের বিদুষী নারী বসিরন নেছা খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করেন।
কবি শেখ ফজলল করিম সামান্য চাকরি ছেড়ে তিনি নিজেকে সাহিত্য ও সমাজসেবায় সঁপে দেন। নিজস্ব সঞ্চয়ের দেড় হাজার টাকায় কাকিনায় ‘সাথাবিদ্য প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ নামে ছাপাখানা বসান। ১৯০৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা করেন ‘বাসনা’ মাসিক পত্রিকা। এখান থেকে ‘জমজম’, ‘কল্লোলিনী’ ও ‘রত্নপ্রদীপ’ও প্রকাশিত হত।
পদ্য-গদ্য মিলিয়ে তার প্রায় ৪৫টি গ্রন্থ রয়েছে। ‘তৃষ্ণা’, ‘পরিত্রাণ কাব্য’, ‘ভগ্নবীণা’, ‘লাইলী-মজনু’, ‘পথ ও পাথেয়’ ও ‘আফগানিস্তানের ইতিহাস’ অন্যতম। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘নীতিভূষণ’, ‘সাহিত্য বিশারদ’ ও ‘কাব্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন।
কবির বাস্তুভিটায় গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ আধাপাকা ঘরের একটি কক্ষে চরম অযত্নে পড়ে আছে কবির ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী কাঠের খাট, আরামচেয়ার, প্রিয় টুপি, দোয়াত-কলম, ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কোরআন শরীফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস ও অন্যান্য দুর্লভ সরঞ্জাম। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কবির উত্তরসূরিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো আগলে রাখছেন। যা এখন তাদের সাধ্যের বাইরে।
অন্যদিকে, কাকিনা বাজারে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে ২০০৫ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে ‘কবি শেখ ফজল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার’ নির্মিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা তালাবদ্ধ। অযত্ন-অবহেলায় জ্ঞানচর্চার এই কেন্দ্রটির ফটক দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। চারপাশ রূপ নিয়েছে বর্জ্যের স্তূপে।
মোখলেছুর রহমান নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘দেশের এত বড় পণ্ডিতের স্মৃতি অযত্নে নষ্ট হচ্ছে। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় বা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ উদ্যোগ নিলে এগুলো সংরক্ষণ সম্ভব। কালজয়ী কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজো চরম অবহেলা আর অযত্নে অবলুপ্তির পথে। অথচ তার লেখনী যুগের পর যুগ মানুষকে মানবতার শিক্ষা দিয়েছে।’
কবির পুতি শেখ ফিরোজ বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন সাহিত্যানুরাগী আসেন। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটে স্বজনদের পক্ষে স্মৃতি রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচিত অবিলম্বে জাদুঘর নির্মাণ করে এগুলো সংরক্ষণ করা। একইসাথে কবির ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক’ কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাই।’
প্রবাহমান সময়ের গতিতে কবি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তার অনন্য সৃষ্টি। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাসের আলো দেখাতে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা লালমনিরহাটবাসীর।



