আলোচনা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘শোক ও বিজয় ২০২৬’ উদযাপন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই ৩৬ এক ফালি রোদ’ শীর্ষক এই আয়োজন।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম।
বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক বরেণ্য কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক কাজী জেসিন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের মহাসচিব রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
সভাপতিত্ব করেন জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক সংগীতশিল্পী ইথুন বাবু।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কেউ কেউ পালিয়ে চলে যাওয়ার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। জনগণের ভোটাধিকারের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। ফলে আমাদেরকে জেলে যেতে হয়েছে, মিথ্যা মামলায় হয়রানি হতে হয়েছে, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। আমাদের সব নেতাকেই অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের তরুণরা ফ্যাসিবাদের লাগাম টেনে ধরেছিল। দুনিয়া কাঁপানো ২০ দিনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে জুলাই যোদ্ধারা। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে পরবর্তীতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিএনপি সরকার গঠন করে। আমরা জানতাম হাসিনা টিকে থাকতে পারবে না। কারণ, নমরুদ, ফেরাউন, হিটলার, হালাকু খান কোনো জালিমই টিকে থাকতে পারেনি; তাই হাসিনাকেও বিদায় নিতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জাসাসের ভূমিকা প্রশংসনীয়।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, ‘সংস্কৃতির ওপর ভর করে ফ্যাসিবাদ যাতে ফিরে আসতে না পারে, সেই দায়িত্ব সংস্কৃতি কর্মীদেরকেই নিতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছেন; আর ফ্যাসিস্ট হাসিনা গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল।’
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।’
রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘একটা দল ও একটা গোষ্ঠী জুলাইকে নিজেদের কুক্ষিগত করতে চায়। কিন্তু গত ১৭ বছরে বিএনপির প্রতিটি কর্মী জুলাই যুদ্ধ করেছে। আমাদের অস্তিত্বের জন্য জুলাইকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করতে চাই।’
কাজী জেসিন বলেন, ‘কালচারাল অঙ্গনকে ব্যবহার করেই বাংলাদেশে ফ্যাসিজম শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। বিরোধী মতের শিল্পী ও সাংবাদিকদেরকে তাদের মত প্রকাশে বাধা দেয়া হয়েছিল। ১৬ বছরে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা কী বয়ান তৈরি করেছিল সেটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মানে আগস্ট এলে ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ না, বাঙালি সংস্কৃতি মানে মুজিব বন্দনা না। আমাদের আবহমান সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশ করতে হবে। সেই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন কাজ করছে।’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টরা সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে তাদেরকে কোনোভাবেই সঙ্ঘবদ্ধ হতে দেয়া হবে না। যেকোনো মূল্যে তাদেরকে রুখে দেয়া হবে।’
শাহীন শওকত বলেন, ‘খুনি হাসিনার মধ্যেই পৃথিবীর চরমতম ফ্যাসিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। আমরা হাসিনার নারকীয় দুঃশাসন ভুলে গেলে আমাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। মুগ্ধ, আবু সাঈদকে আমরা ভুলে গেলে গোটা জাতির সাথেই বেঈমানি করা হবে। ১৭ বছরের গুম, খুন ও বিএনপির ওপর যে অমানবিক নির্যাতন হয়েছিল, সেই নারকীয়তা সহজেই ভোলা যাবে না। কালচারাল ফ্যাসিজম থেকেও জাতিকে মুক্ত করতে হবে।’
সভাপতির বক্তৃতায় ইথুন বাবু বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা যখন কথায় কথায় বলতো এটা ওর বাপের, ওটা ওর বাপের— এসব কারণেই ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গানটি লিখেছি। মানুষের মনের কথা প্রকাশ করার জন্যই গানটি লিখেছি। বেগম খালেদা জিয়ার ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উনাকে বের করে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। জুলাই যুদ্ধে যারা পা হারিয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন তারা এখন পরিবারের কাছেও বোঝা। আজকে ৫ আগস্ট না ঘটলে আজকে আমাদের সবাইকে আয়নাঘরে বা জেলে থাকতে হতো, ফাঁসিতে ঝুলতে হতো ‘
আলোচনা পরবর্তী সাংস্কৃতিক আয়োজনের শুরুতেই ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি দলীয়ভাবে পরিবেশন করেন জাসাসের শিল্পীরা।
এরপর আলম আরা মিনু পরিবেশন করেন ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা’।
সাংস্কৃতিক পর্বে আরো অংশ নেন নতুন কুঁড়ি ও জাসাসের শিল্পীরা।



