২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩১, ২৬ শাবান ১৪৪৬
`

রমজানের গুরুত্ব ও করণীয়

-

সৃষ্টির সূচনা থেকেই স্রষ্টা বছর গণনার জন্য ১২টি মাস নির্ধারণ করেছেন (সূরা তওবা-৩৬) সে অনুযায়ী হিজরি সনের নবম মাসের নাম রমজান। পবিত্র কুরআনে কেবল রমজান মাসের নামই উল্লেøখ করা হয়েছে (সূরা বাকারা-১৮৫)।
রমজ থেকে রমজান। রমজ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়া। পচা পুরাতন অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক যেকোনো কিছুকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা। এ দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের সব পাপ অন্যায় ও গুনাহকে যে মাসে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলা হয় সে মাসই হলো রমজান। অন্য দিকে মানুষের মধ্যে পাপ কাজের যে আকাক্সক্ষা বা উৎস সেগুলোকে ধ্বংস করার উদ্যোগকেও রমজ বলা যেতে পারে। রমজান মাসে মানুষ তার কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে, তার উৎসকে সমূলে ধ্বংস করে। একই সাথে সৎ ও সফল মানুষ হিসেবে জীবন যাপনের পথে অগ্রসর হওয়ার শপথ নেয়। তাই তো পবিত্র কুরআন ও হাদিস থেকে পাই-
রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস। আর কুরআন হলো মানবজাতির জন্য হেদায়াত, সব হেদায়াতের মধ্যে সুস্পষ্ট এবং সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী (সূরা বাকারা-১৮৫)।
- কুরআন বিশ^াসী ও অনুসরণকারীর জন্য হাশরের মাঠে কুরআন সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে (বায়হাকি, মুসনাদে আহমদ)।
- রমজান মাসে রয়েছে হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কদরের রাত, যে রাতে জিবরাইল আ: ফেরেশতাসহ যাবতীয় বিষয়ে শান্তির বারতা নিয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন (সূরা কদর : ১-৪)।
- ঈমান ও ইহতিসাবসহ কদরের রাতে ইবাদতকারীর অতীতের সমস্ত পাপ মাফ করে দেয়া হয় (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি)।
- রমজান মাস ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রোজা রাখার মাস। আর রোজা মানুষকে মুত্তাকি বানায় (সূরা বাকারা : ১৮৩-১৮৫)।
- ঈমান ও ইহতিসাবসহ রমজানের রোজা পালনকারীর অতীতের সমস্ত পাপ মাফ করে দেয়া হয় (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।
- সঠিকভাবে রমজানের রোজা পালনকারী ঈদের দিন সকালে সদ্য প্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায় (মুসান্নেফ ইবনে আবি শায়বা)।
- আল্লাহ বলেছেন- ‘রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর পুরস্কার’ (বুখারি, মুসলিম)।
- রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ- একটি ইফতারের সময়-অন্যটি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময় (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)।
- রমজানের রোজা পালনকারী রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে (বুখারি, মুসলিম)।
- রমজানের রোজা পালনকারীর জন্য পরকালে রোজা সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে (মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকি)।
- শরয়ী কারণ ব্যতীত রমজানের একটি রোজা ছেড়ে দিলে জীবনভর রোজা দিয়েও ক্ষতি পূরণ হবে না (বুখারি, তিরমিজি)।
- রোজা রেখে মিথ্যা ও অন্যায় করলে তার না খেয়ে থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি)।
- রোজা ঢালস্বরূপ (বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ)।
- রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে কস্তুরি সুগন্ধের চেয়েও অধিক সুগন্ধময় (বুখারি, মুসলিম, ইবনে মাজাহ)।
- সাহরিতে বরকত (মুসলিম, নাসায়ী)।
- তাড়াতাড়ি ইফতারি করাতে মঙ্গল (মুসলিম, তিরমিজি)।
- রমজান মাস শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মাস (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, নাসায়ী)।
- রমজান মাস জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করার মাস (সহিহ বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, নাসায়ী)।
- রমজান মাস জান্নাতের দরজা খুলে দেয়ার মাস (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, নাসায়ী)।
রমজানে একটি ফরজ ৭০টি ফরজের এবং একটি নফল একটি ফরজের সমান হয় (বায়হাকি)।
- রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘রমজান মাসে আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়’ (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)।
- রমজান মাস কুরআন শোনা ও শোনানোর মাস।(বুখারি, নাসায়ী)।
রমজান সওয়াব ঝরার ঝড় : রমজান মাসে মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে প্রচুর সওয়াবের অধিকারী করতে চান। এ সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়। ঝড়ের মতো এটা আসে আবার হঠাৎই থেমে যায়। এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই সওয়াব কুড়াতে হয়। সময়ে না কুড়ালে পরে আর সুযোগ থাকে না। ঘরে বসে থাকলে চলবে না। ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুতের চমক সব কিছুকে উপেক্ষা করেই আম কুড়াতে হবে।
আল্লাহ প্রিয় মানুষদের জন্য রমজান মাস আম সিজনে আমের ব্যবসায়ীর চেয়েও প্রিয়। কী খেল, কোথায় ঘুমালো কোনো দিকে খেয়াল নেই। দিন-রাত শুধু আম দেখে, যত ট্রিপ তত টাকা। এই ধাঁধা তাকে অকল্পনীয় দুঃখ কষ্ট হজম করে লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। মৌসুম শেষে ক্লান্ত শ্রান্ত দেহ আরামের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে।
রমজান খুব দামি এক মেহমান : মেহমান কাকে বলে? যে সাড়া বছর ধরে সবসময় থাকে না।
দামি মেহমান কে?- যার কাছে অনেক দামি কিছু পাওয়া যায়।
মেহমানের জন্য করণীয়- অভ্যর্থনা-থাকার ব্যবস্থা- খাওয়ার ব্যবস্থা-বিনোদন ও আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা- উপহার সামগ্রীর ব্যবস্থা-বিদায় সংবর্ধনা।
রমজান নামক দামি মেহমানের অভ্যর্থনা- অতি উন্নতমানের দোয়া ও ইস্তিগফার। পরিপূর্ণ বিশ্বাস, সচেতনতা, আত্মসমালোচনা ও উন্নত কাজকর্ম। একই সাথে থাকার ব্যবস্থা-আনন্দে ভরা নামাজ, খাওয়ার ব্যবস্থা-কুরআন শিক্ষা ও প্রচার। বিনোদন ও আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা- উন্নত আচার-আচরণ ও চারিত্রিক গুণাবলি-সঠিক রোজা। উপহার সামগ্রীর ব্যবস্থা এবং বিদায় সংবর্ধনা-ইতিকাফ-প্রচার-আর্থিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি।
রমজান নিয়মনীতি পালনের মাস : সৃষ্টি জগতের সবখানে সুনির্দিষ্ট নিয়ম প্রতিষ্ঠিত। এ নিয়মের সামান্য অন্যথা হলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। মানুষের প্রধান শত্রু শয়তান মানুষকে অনিয়মের মধ্যে টেনে আনে। রমজান বিভিন্ন কলা-কৌশল ও কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষকে নিয়ম পালনের আওতায় নিয়ে আসে।
সুনির্দিষ্ট সময়ে সাহরি ও ইফতারির অভ্যাস রোজাদারকে খাদ্য গ্রহণের নিয়মের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ও সজাগ বানিয়ে দেয়। ঘুম বিশ্রাম ও আরাম আয়েশসহ যাবতীয় ব্যাপার রমজানের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা একেবারে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। রমজানের একটি মাসের নিয়ম পালনের অভ্যাস বছরের বাকি সময়ে দৈনন্দিন কার্যক্রমের সব দায়িত্ব সঠিক সময় ও নিয়মানুযায়ী করার প্রশিক্ষণ দেয়।
রমজান হলো শয়তানের বন্দিশালা থেকে পালানোর মাস : এ পৃথিবীতে মানুষের জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয়। নানাবিধ সমস্যা ও সঙ্কটের মধ্য দিয়ে তার জীবনের তরী বয়ে চলে। তার প্রধান শত্রু হলো শয়তান। সে নানাভাবে মানুষকে বিপথে নেয়। মানুষ শয়তানের প্রভাবে দৈনন্দিন জীবনে নানাবিধ অন্যায়-অনিয়মের মধ্যে পা দেয়। পাপ করে, অপরাধী হয়। পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে শয়তান পথভ্রষ্ট করে। ছলে-বলে কৌশলে সে মানুষকে তার বন্দিশালায় আটকে ফেলে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বাঁচানোর জন্য রমজান মাসে শয়তানকে বন্দী করে রাখেন। মানুষ ভুল স্বীকার করে সুপথে ফিরে আসার সুযোগ পায়। শয়তানের সারা বছরের অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সে জন্য রমজান মুমিনের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক অবিস্মরণীয় নিয়ামত। রমজান হলো শয়তানের বন্দিশালা থেকে পালানোর মাস।
স্রষ্টায় বিশ্বাসীদের কাছে রমজানের অনেক দাম, অনেক মর্যাদা। সহিহ ইবনে হিব্বান থেকে জানা যায় রাসূলুল্লাহ সা: সুস্পষ্টভাবে সাবধান করে দিয়েছেন-
এমতাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই রমজানের আসল ফায়দা হাসিলকারীরা সামনের রমজানকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে মনে করে দুই হাত-পা গুটিয়ে অকর্মণ্য অথর্ব হয়ে বসে থাকতে পারে না! বরং প্রকৃত রমজান পালনকারী খুবই দৃঢ় আস্থাশীলতাসহ নিজেকে যথেষ্ট ভাগ্যবান মনে করবেন ।
মহামহিম আল্লাহর কাছে সার্বক্ষণিক আকুতি রমজানের প্রাপ্তি নিয়ে যেন সবসময় আনন্দিত থাকি-আশান্বিত হই। হে আল্লাহ! অবিস্মরণীয় তাৎপর্যে ভরা ২০২৫ সালের রমজান সফল করার ক্ষেত্রে বিশ^ব্যাপী নেতৃত্বদানে যাদেরকে আপনি নির্বাচিত করছেন- আপনি দয়া করে আমাদেরকেও তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় (অবসরপ্রাপ্ত)


আরো সংবাদ



premium cement