দখল-দূষণ-ভরাট ও কচুরিপানায় অস্তিত্ব সঙ্কটে ফুলপুরের খরিয়া নদী

হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

নয়া দিগন্ত অনলাইন
Printed Edition
দখল, দূষণ, ভরাট ও জমাট বাঁধা কচুরিপানার দৌরাত্ম্যে বিলুপ্তপ্রায় ময়মনসিংহ ফুলপুরের প্রাণ খরিয়া নদী
দখল, দূষণ, ভরাট ও জমাট বাঁধা কচুরিপানার দৌরাত্ম্যে বিলুপ্তপ্রায় ময়মনসিংহ ফুলপুরের প্রাণ খরিয়া নদী |নয়া দিগন্ত

মফিজুল ইসলাম অলি ফুলপুর (ময়মনসিংহ)

এক সময়ের খরস্রোতা, অফুরান মৎস্য স¤পদের আধার ময়মনসিংহের ফুলপুরের প্রাণ খরিয়া নদী এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। দখল, দূষণ ও নাব্যতা সঙ্কটে ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী এই জলধারা। অপরিকল্পিত বর্জ্যব্যবস্থাপনার কারণে পানি দূষণ আর নদীর তলদেশ ভরে যাওয়ায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মাছের আবাসস্থল খরিয়া নদী। ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে বেদখল হচ্ছে নদীর পাড়। নদীর এই করুণ অবস্থার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফুলপুর পৌর শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খরিয়া নদীটির উৎপত্তিস্থল উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও পতিতস্থল একই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কংশ নদ। উৎসমুখ থেকে মোহনা পর্যন্ত খরিয়ার দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার। নদীটি এক সময় ছিল বেশ খরস্রোতা। এই নদীর কল্যাণে ফুলপুর, রূপসী, ডেফুলিয়া, বাহাদুরপুরসহ অনেক হাট-বাজার ছিল ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য কেন্দ্র।

দেশীয় মাছের বিরাট প্রাকৃতিক উৎস হওয়ায় নদী তীরবর্তী অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছিল জেলেদের বসতি। খরিয়া নদীর তীরবর্তী রূপসী, ঘোমগাঁও, পাইকপাড়া, দিউ, যোগীরগুহা, বাহাদুরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত জেলে পরিবার এখনো রয়ে গেছে। তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে এখন অন্য পেশায় চলে গেছে।

সময়ের বিবর্তনে গভীরতা হ্রাস পেয়ে নদীটি নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে শুকনো মৌসুমে এই নদীর তলদেশ এখন Ÿিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারানোর ফলে বর্ষাকালেও নদীটি প্রায় গতিহীন থাকে। স্রোত না থাকায় ফুলপুর শহরের বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জমাট বাধা দূষিত পানি নদীটিকে কার্যত একটি বিষাক্ত নর্দমায় পরিণত করেছে। পৌর শহর ও আশপাশের বর্জ্য মিশে পানির গুণাগুণ মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। পানি দূষণ, বর্জ্য ও অতিরিক্ত কচুরিপানার কারণে নদীর পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতায় লাখ লাখ টাকার মাছ সম্প্রতি মরে ভেসে ওঠার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নদী তীরবর্তী কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও বাঁধ দিয়ে ফিশারি স্থাপন করায় পাানির স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হয়ে ক্রমে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে বাঁধ, বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে বর্ষাকালেও পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ না থাকায় জমাট বাঁধা কচুরিপানায় নদীটি এখন ভরা মৌসুমেও নিষ্প্রাণ।

নদীর জায়গা বেদখল প্রসঙ্গে ফুলপুর শহরের বাসিন্দা এনজিও কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, খরিয়া নদী আমাদের জীবন জীবিকার সাথে মিশে আছে। আমরা ফুলপুরবাসী এই ঐতিহ্যকে হারাতে চাই না। তাই অবিলম্বে সিএস রেকর্ড অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও খননের মাধ্যমে নদীটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

নদীর পানি দূষণের ফলে মৎস্যসম্পদের বিপুল ক্ষতিসাধন হচ্ছে- এমন দাবি করে পুরাতন ডাকবাংলো এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মাধ্যমে পৌর শহরের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। যারা নদীদূষণ ও দখলের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি খরিয়া নদীতে বিপুল পরিমাণ মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনায় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার উজ্জল হোসেন জানান, এর কারণ পানিদূষণ। ফুলপুর শহরের প্রায় সব বর্জ্যই এই নদীতে পড়ে। এর আরেকটি কারণ নদীর উৎসমুখের বাঁধ। নদীতে অবৈধ বাঁধ দিয়ে পানির গতিপথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। পানি চলমান থাকলে জলজপ্রাণীর জীবনধারণ সহজ হয়। এসব বাঁধ অপসারণে সম্প্রতি এক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

খরিয়া নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি ফুলপুরের মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর মরে যাওয়া মানে একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। তাই দখলমুক্ত ও নদী খননের মাধ্যমে খরিয়া নদীটি বাঁচিয়ে রাখার জনদাবি মূল্যায়ন করে সরকারি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।