আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ক্ষুদ্র পশু খামারি ও গৃহস্থদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে গবাদি পশুর ভাইরাসজনিত রোগ ‘লাম্পি স্কিন’ (এলএসডি)। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ও ভ্যাকসিনের অভাবে গত এক মাসে শুধু নিকলী উপজেলার একটি ইউনিয়নেই দুই শতাধিক বাছুরের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত বাছুরগুলোর মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশের বেশি। তবে সরকারি হিসাবের সাথে মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অমিল রয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, সরকারি পর্যায়ে তদারকির ঘাটতি এবং সময়মতো প্রতিষেধক ভ্যাকসিন না পাওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সামনে কোরবানির ঈদ উৎসব থাকলেও, এই রোগে আক্রান্ত পশু সুস্থ হওয়ার পরও শরীরে ক্ষতচিহ্ন থেকে যাওয়ায় হাটে তা বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে চরম অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক খামারিরা।
লক্ষণ ও রোগ ছড়ানোর মাধ্যম
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, লাম্পি স্কিন মূলত গরুর একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত পশুর শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ঘাড়, পিঠ, পা ও ওলানসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে শক্ত গুটি বা ফোসকা দেখা দেয়, যা পরে গভীর ক্ষতে পরিণত হয়। আক্রান্ত পশুর চোখ-নাক দিয়ে পানি পড়ে, মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরে এবং খাওয়া-দাওয়া একবারে বন্ধ হয়ে যায়। গবাদি পশু দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি ওলান ও পা ফুলে যায় এবং গর্ভবতী গাভীর ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, এই রোগটি সাধারণত মশা, মাছি, আটালি (টিক) এবং আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে থাকা দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে সঠিক সময়ে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা, খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পশু রক্ষা করা সম্ভব।
মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ চিত্র
সরেজমিন নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের সাজনপুর, আঠারবাড়ীয়া, সিঙ্গারপাড়া ও দক্ষিণহাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় ঘরে ঘরে বাছুরের মৃত্যুর চিত্র। আঠারবাড়ীয়া গ্রামের খামারি ইন্নাছ আলী, লাল হোসেন, নিয়াশা, বাদল, আরজ আলী, চান মিয়া ও জজ মিয়াসহ অনেকেরই ২ থেকে ৫ মাস বয়সী বাছুর এই রোগে মারা গেছে।
আঠারবাড়ীয়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক কামরুল ইসলাম নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমার নিজের খামারের একটি বাছুরের প্রথমে জ্বর ও ফোসকা দেখা দেয়। পরে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে ফোসকা ফেটে চামড়া ও গোশত পচে দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। পশুর গায়ের গর্ত থেকে আমি নিজে সাদা পোকা বের করেছি। দীর্ঘ এক মাস ধরে বাছুরটি অবর্ণনীয় কষ্ট পাচ্ছে। গ্রামীণ খামারিদের অভিজ্ঞতায়, আক্রান্ত ছোট বাছুরগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই মারা যাচ্ছে।’
জারইতলা ইউনিয়নের এআই টেকনিশিয়ান জাহাঙ্গীর আলম মেনু মিয়া জানান, গত দুই মাসে কেবল জারইতলা ইউনিয়নেই অন্তত দুই শতাধিক গবাদি পশু মারা গেছে, যার বেশিরভাগই দুগ্ধজাত বাছুর।
সরকারি ভ্যাকসিন সঙ্কটের কথা স্বীকার
নিকলী উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা: মোহাম্মদ আবু হানিফ জানান, ‘লাম্পি স্কিন রোগটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারিভাবে এই রোগের ‘লাম্পি ডিজিজ ভ্যাকসিন’-এর সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। তবে বেসরকারিভাবে ভেটেরিনারি ফার্মেসিগুলোতে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন ২৫০ টাকায় পাওয়া যায়। তা এনে দিতে পারলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গবাদি পশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব।’
সরকারি হিসাবে গত মাসে নিকলীতে ৮০টি পশুর মৃত্যুর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বছরে মোট ১৯০টি পশুর মৃত্যুর তথ্য তাদের দফতরে রয়েছে। উপজেলাটিতে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: আব্দুল মান্নান জানান, জেলার মোট গবাদি পশুর তুলনায় ভ্যাকসিনের বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য। তিনি বলেন, ‘আগে দেশে এই রোগের ভ্যাকসিন তৈরি হতো না, এখন সীমিত আকারে হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে পুরো জেলার ১৩টি উপজেলার জন্য আমরা মাত্র দুই হাজার ডোজ সরকারি ভ্যাকসিন পেয়েছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।’
তবে নিকলী উপজেলায় এক মাসেই ৮০টি বা গবাদি পশু মারা যাওয়ার খবর শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং জানান, মাঠপর্যায় থেকে স্থানীয় কর্মকর্তারা তাকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানাননি।
হাওরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং কোরবানির ঈদের আগে প্রান্তিক খামারিদের এই বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে জরুরিভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান ও বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।



