সমতার পথে নানা প্রতিশ্রুতি শেষ মুহূর্তে হতাশার হাতছানি

আগামী কপ ৩১ তুরস্কে হবে

Printed Edition

ধনী দেশগুলোর অনমনীয় মনোভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকট অভাবে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩০) ব্যর্থতার কালো মেঘে ঢেকে গেছে। সমতা ও ন্যায়বিচারের পথে নানা আলোচনা এবং প্রতিশ্রুতির পরেও, উন্নত দেশগুলোর একগুঁয়েমির কারণে শেষ মুহূর্তে গভীর হতাশার হাতছানি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছে লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে ধনী দেশগুলোর হতাশাজনক ও অপ্রতুল প্রতিশ্রুতিতে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সরাসরি মন্তব্য করেছেন, ‘সমস্যা অর্থের নয়, সমস্যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার।’

গতকাল শুক্রবার সম্মেলনের শেষ দিন ছিল। স্থানীয় সময় সকালে এই প্রতিবেদন লেখার সময় যুগান্তকারী কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে সম্মেলনস্থলের ব্লু জোনে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। এতে সেখানকার ১৩ জন ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দিনের পরবর্তী কার্যক্রম ব্যাহত হয়। গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আলোচনা চলছিল, ধারণা করা হচ্ছে সম্মেলনের সময় আরো এক দিন বাড়তে পারে। পরবর্তী কপ ৩১ সম্মেলন তুরস্কের আনাতলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে।

ব্রাজিলের বেলেমে জাতিসঙ্ঘের কপ-৩০ সম্মেলনের গত বৃহস্পতিবার ১১তম দিনে বিশ্ব জলবায়ু অঙ্গনে এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে। বিজ্ঞান, মানবাধিকার, সমতা, নারী নেতৃত্ব, স্থানীয় জ্ঞান এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের সুর মিলেমিশে এক বহুবর্ণের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির ছবি তৈরি করে এ দিন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষের জীবন, সমাজ ও প্রকৃতিকে একযোগে সুরক্ষার আহ্বান যেখানে কৃষি থেকে খাদ্যব্যবস্থা, নারী থেকে আদিবাসী, কৃষক থেকে তরুণ প্রত্যেকেই সমান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কপ-৩০-এর এই দিনে প্রতিফলিত হলো যে জলবায়ু সঙ্কট কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি বৈষম্য, অধিকার, উন্নয়ন এবং অস্তিত্বের প্রশ্নও বটে। এদিন ব্রাজিলে পালিত হয় ‘ন্যাশনাল ডে অব ব্ল্যাক কনশাসনেস’, যা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, অধিকার ও অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই বিশেষ দিনে কপ-৩০-এর আলোচনায় অন্তর্ভুক্তি এবং ন্যায়বিচারের ধারণা আরো দৃঢ় হলো। রাজনৈতিক বক্তৃতার পরিবর্তে মানবিক গল্প, সামাজিক বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক বৈষম্যের প্রভাবকে কেন্দ্র করে জলবায়ু সমাধানের কাঠামো তৈরি হলো।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্রভাবে আঘাত করছে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ফ্রন্টলাইন সমাজকে। কপ-৩০-এর ১১তম দিনে এভাবেই দেখাল সমতা ছাড়া জলবায়ু সমাধান অসম্ভব। বন থেকে সমুদ্র, শহর থেকে গ্রাম, উন্নত থেকে উন্নয়নশীল সবার কণ্ঠ আজ এক বিন্দুতে মিলেছে। অঙ্গীকারের যুগ শেষ, বাস্তব ফল দেখানোর সময় এসেছে।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস দিনটির সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা দেন আবেগ, সতর্কতা ও দৃঢ়তার এক মিশ্রণে। তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে হতাশার সাথে আশার মিশেল, ‘এই সঙ্কট কারো জন্য অপেক্ষা করবে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, খরা, বন্যা, ঝড় প্রতিদিন মানুষ জীবন হারাচ্ছে, তারা বিশ্ব নেতাদের প্রশ্ন করছে : আর কত অপেক্ষা?’ গুতেরেসের বক্তব্যে মানবতার মৌলিক দাবি স্পষ্ট এখনই সমঝোতা, এখনই সাহস, এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়।

বৃহস্পতিবার দিনটি শুরু হয় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত নারী ও কিশোরীদের জলবায়ু নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে। বক্তারা বলেন, জলবায়ু সঙ্কটের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্রভাবে আঘাত করে সেই জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা ঐতিহাসিক বৈষম্যের কারণে বহুস্তরীয় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কৃষি, পানি, জীবিকা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত নারীরা জলবায়ু ন্যায়বিচারের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের দ্বিতীয় দশক (২০২৫-২০৩৪) সামনে রেখে তাদের নেতৃত্ব আরো শক্তিশালী করার আহ্বান উঠে আসে।

পরবর্তী সেশনে কপ-৩০-এর বিশেষ দূতরা জলবায়ু সঙ্কট, জাতিগত বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। বক্তারা বলেন, জলবায়ু সঙ্কট কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি মানবাধিকারের সঙ্কটও, যা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বর্ণবাদ, দারিদ্র্য দূরীকরণে।