নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র চার দিন বাকি। কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে পর্যাপ্ত গরু-ছাগল আসতে থাকলেও এখন পর্যন্ত বিক্রি সেভাবে জমে ওঠেনি। বাজারে এক দিকে ক্রেতার ভিড় নেই, অন্য দিকে যারা আসছেন তারা গরু-ছাগলের দাম পরখ করে চলে যাচ্ছেন। বেপারিরা কোরবানির পশুর অতিমূল্য হাঁকানোয় ক্রেতারা পশু ক্রয়ে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছেন বলে একাধিক ক্রেতার সাথে আলাপ করে জানা গেছে। আবার বেপারিরা জানিয়েছেন তারা এখনো বাজার পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা বুঝে উঠতে পারছেন না। অধিকাংশ বেপারিই বাজারে নিয়ে আসা পশু বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বাজারের উচ্চ হাসিলের কারণে ক্রেতা আসছে না বলেও জানান।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন প্রান্তে এবার মোট ১১টি পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে সাগরিকা ও বিবিরহাট বাজার দু’টি স্থায়ী। এ ছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের হাটটিও স্থায়ী। এর বাইরে আটটি অস্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে দু’টি দরপত্রের মাধ্যমে পাঁচটি দরপত্র ছাড়াই সরকার সমর্থক বিভিন্ন ব্যক্তিকে ইজারা দিয়েছে সিটি করপোরেশন। অস্থায়ী পশুর হাটগুলো হচ্ছে- ৩৭ নং দক্ষিণ হালিশহর আনন্দবাজারসংলগ্ন রিং রোডের খালি জায়গার হাট, ৩৯ নং হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিংরোডস্থ সিডিএ বালুর মাঠের হাট, ৪০ নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের সাইলো রোডের টিএসপি মাঠসংলগ্ন বাজার, সিআইপি জসিমের মাঠের হাট, ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন টানেলের উত্তর পাশের আলমগীর সাহেবের বালুর মাঠ, ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের গলিচিপাপাড়া বারুনিঘাটা মাঠ, নগরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কর্ণফুলী গরুর বাজার (নুর নগর হাউজিং এস্টেট), ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াজেদিয়া মোড়ের অস্থায়ী হাট।
ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব হাটে গরু নিয়ে এসেছেন। গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে নগরীর স্থায়ী-অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে কুষ্টিয়া, মাগুরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা, নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গরু আসতে শুরু করে। তবে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে চট্টগ্রামের চাহিদার ৯৫ শতাংশের বেশি স্থানীয়ভাবে পূরণ হবে।
সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাসমাগম খুব একটা বেশি নেই। ক্রেতারা হাট ঘুরে গরু দেখছেন, দর দাম পরখ করছেন। তবে গতকাল শনিবার এবং এর আগের দিন শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ক্রেতাসমাগম ঘটলেও তেমন বিক্রি হচ্ছিল না চট্টগ্রামের পশুর হাটগুলোতে।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কোরবানি ঈদের আর মাত্র চার দিন বাকি থাকলেও পশুর হাটগুলোতে এখনো জমে ওঠেনি পশু বিক্রি। বিক্রির উদ্দেশ্যে দেশের নানা প্রান্ত থেকে গরু নিয়ে হাজির হচ্ছেন বেপারিরা। তবে এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। অন্যান্য বছর শত শত পশুবাহী ট্রাক পশুর হাটগুলোর সামনে অপেক্ষমাণ দেখা গেলেও এবার সে চিত্র একেবারেই নেই বললে চলে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাজারে : চট্টগ্রামের কোরবানিদাতাদের বেশির ভাগই এককভাবে পশু কোরবানি দিতেন। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবার অনেকেই এককভাবে একটি পশু কোরবানি না দিয়ে কয়েকজন মিলে একটি পশু কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে আবার চাহিদা বেড়েছে ছোট গরুর। এর প্রভাবও লক্ষ করা গেছে বাজারে। পশুর হাটগুলো ছোট গরুতে ঠাসা। আবার অনেকেই কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। আবার কেউবা বিভিন্ন এগ্রোফার্ম বা স্থানীয়ভাবে নিজেদের বাজেটের মধ্যে পশু সংগ্রহ করছেন। ফলে সব মিলিয়ে এবার কোরবানির পশুর হাটে ক্রেতার উপস্থিতি এবং বিক্রি তুলনামূলক কম।
নগরীর স্থায়ী গরুর বাজার বিবিরহাটে গতকাল শনিবার বিকেলে হাতেগোনা ক্রেতার দেখা মেলে। ক্রেতার অভাবে গরুর বেপারি ও রাখালরা অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। কেউ ঘুমিয়ে, আবার কেউবা লুডু খেলে সময় পার করছিলেন।
বেপারি ও ক্রেতারা যা বলছেন : মহররম বেপারি ২১টি গরু নিয়ে লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে এসেছেন। তিনি জানান, দুই দিনে মিলে একটি গরু বিক্রি করেছেন। বিকেলের দিকে লোকজন কিছু আসে। গরু দেখে কিন্তু কিনে না। আবার কেউবা ২০০ টাকার গরু (মানে দুই লাখ) এক শ’র (এক লাখ) নিচে চায়।
নোয়াখালীর রামগতি আলেকজান্ডার থেকে ৩৪টি গরু নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন কবির বেপারি। বাজারের হাসিল (হাজারে ৫০ টাকা) বেশি হওয়ায় মনে হয় ক্রেতারা আসছেন না। ফলে তিনি অনেকটাই হতাশ।
চুয়াডাঙ্গা থেকে ৩০টি গরু নিয়ে এসেছেন সিরাজ উদ্দিন। তিনি জানান, বাজার একেবারেই ঠাণ্ডা, লোক নেই। নির্ধারিত হাসিল হলে হয়তো আরো ক্রেতা আসত। বাজার বুঝে উঠতে পারছেন না বলেও তিনি জানান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থেকে ২২টি গরু নিয়ে এসেছেন মাসুদ রানা বেপারি। দুই দিন আগে গরু নিয়ে এলেও কোনো বেচাকেনা নেই বলে জানান।
কোরবানির গরু পছন্দ করতে বিবিরহাটে এসেছেন মো: খোরশেদ। পেশায় শিক্ষক এই ক্রেতা একটি গরু পছন্দ করে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের দেখাচ্ছিলেন। এই প্রতিবেদকের কথা হয় তার সাথে। তিনি অভিযোগ করছিলেন এক দিকে বাজারে পশুর দাম অত্যধিক হাঁকানো হচ্ছে, অন্য দিকে বাজারে পর্যাপ্ত পশু আসেনি বলেও তার দাবি। তিনি যে গরুটি পছন্দ করেন বেপারি সেটির দাম হাঁকান আড়াই লাখ টাকা। অথচ সেটি এক লাখ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয় বলেও এই ক্রেতার দাবি। বেসরকারি চাকরিজীবী আবু সাদিত নয়া দিগন্তকে বলেন, এক দিকে পশুর দাম বেশি হাঁকা হচ্ছে, অন্য দিকে উচ্চ হাসিল। ফলে ক্রেতারা বাজার পর্যবেক্ষণ করেই চলে যাচ্ছেন শেষ দিকে দাম কমার আশায়।
বিবিরহাট গরুর বাজারের ইজারাদারের প্রতিনিধি রিয়াদুল ইসলাম আকাশ নয়া দিগন্তকে জানান, হাসিল নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার বলেছে সাড়ে ৭ শতাংশ নিতে, কিন্তু আমরা নিচ্ছি ৫ শতাংশ। এর বাইরেও কেউ এসে কম দিতে চাইলে আমরা ছাড় দিচ্ছি। তিনি জানান, ৬০ হাজার থেকে শুরু করে ছয় লাখ টাকার পর্যন্ত গরু এই বাজারে এসেছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় নিচে পাকা এবং উপরে ত্রিপল দিয়ে আচ্ছাদন দিয়ে পুরো বাজার সিসিটিভির আওতায় রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক লেনদেনের জন্য কাউন্টার ও এটিএম বুথ স্থাপন করেছে। পশুর বাজার দর রিজনেবল বলেও তিনি দাবি করেন।
কমেছে পশুর চাহিদাও : প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলছিল। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল আট লাখ ৮৫ হাজার। সর্বশেষ ২০২৫ সালে চাহিদা ছিল আট লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টিতে। কিন্তু এবারের চাহিদা বলা হচ্ছে আট লাখ ১৮ হাজার। ফলে গত বছরের তুলনায় চাহিদা কমেছে।
চট্টগ্রামের প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যানুযায়ী কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চট্টগ্রামে আট হাজারের বেশি খামারি গবাদিপশু পালন করছেন। তথ্যানুযায়ী চলতি বছর চট্টগ্রাম জেলায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মোট প্রাপ্যতা রয়েছে সাত লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ১১৩টি এবং ছাগল, ভেড়া ও অন্য পশু দুই লাখ ৩৬ হাজার ৩৮টি। বিপরীতে জেলার মোট চাহিদা ধরা হয়েছে আট লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি পশু। তবে এর বাইরে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলা ও উত্তরবঙ্গ থেকে প্রতি বছর চট্টগ্রামে গবাদিপশু আসে। কোরবানি উপলক্ষে ওই সব এলাকা থেকে এ বছরও প্রায় ৫০ হাজার গবাদিপশু আসবে। তাই আসন্ন ঈদুল আজহায় গবাদিপশু ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সূত্র জানায়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: আলমগীর বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে জেলায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর চাহিদার তুলনায় ৩৫ হাজার ৫২০টির ঘাটতি রয়েছে। তবে পশুর সঙ্কট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে পশুপালন অনেক বেড়েছে। যে ঘাটতি রয়েছে, তা আশপাশের জেলা ও উত্তরাঞ্চল থেকে সহজেই পূরণ হয়ে যাবে। তিনি জানান, নাটোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে বিপুলসংখ্যক পশু চট্টগ্রামের বাজারে আসে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও বাজারে তার প্রভাব খুব একটা পড়বে না।



