কপোতাক্ষে রাতভর বালু লুট রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

Printed Edition
কপোতাক্ষ নদ থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত
কপোতাক্ষ নদ থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা

খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ নদে জেগে ওঠা কয়েকটি চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের নেতৃত্বে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ভাসমান ড্রেজার ও বাল্কহেড ব্যবহার করে চলছে বালু উত্তোলন। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নদীভাঙন ও নৌ-চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কপোতাক্ষ নদের দশহালিয়া চর, কাশিরহাটখোলা, লোকারচর, কাঠমারচর, মেদেরচর, জেলেখালী, গোবরা, চুরামুখা ও ঘড়িলাল এলাকায় বড় বড় চর জেগে উঠেছে। ফলে খুলনা থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নীলডুমুর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চ, পণ্যবাহী ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচলে বিঘœ ঘটছে।

নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও ভাঙন রোধে কপোতাক্ষ নদের চারটি পয়েন্টকে বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব দিয়ে কয়রা উপজেলার সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ পাঠায়। তবে পরিবেশ অধিদফতরের আপত্তিতে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এই সুযোগে একটি চক্র রাতের আঁধারে নদীর বিভিন্ন চর থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, উত্তোলিত বালু প্রতি ঘনফুট চার থেকে আট টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্বও হারাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে শ্যামনগর উপজেলার যুবলীগ নেতা আব্দুর রহমান বাবু সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে গাবুরা ইউনিয়নসংলগ্ন জেলেখালী চর থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি পান। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে সেই অনুমোদন বাতিল হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এরপর স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় হারুন নামের এক ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, উত্তোলিত বালু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ সংস্কার প্রকল্প, বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ, বাজার ও মাঠ ভরাটসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর চর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বালুর অস্থায়ী আড়তও।

পাউবো খুলনা ও সাতক্ষীরা-২ অঞ্চলের আওতায় কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর তীর সংরক্ষণ এবং বেড়িবাঁধ সংস্কারে চলমান প্রকল্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালুর প্রয়োজন হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই চাহিদা মেটাতেই রাতভর নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

কয়রা-পাইকগাছা উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি এস এ মুকুল বলেন, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হলেও প্রশাসনের কার্যকর তৎপরতা নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করলে নদী শাসনের পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারত, অন্যদিকে উপকূলীয় বেড়িবাঁধও সুরক্ষিত থাকত।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘নদের মাঝখানে চর জেগে ওঠায় পানির প্রবাহ পরিবর্তিত হয়ে বাঁধের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে। নদী ড্রেজিং করে শাসন কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন।’

বিআইডব্লিউটিএর খুলনা ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা নেই। প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘জনবল সঙ্কটের কারণে গভীর রাতে নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তবে নদী ড্রেজিং ও বালুমহাল ঘোষণার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে।’