নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু ব্যবসা ও জবাইসংক্রান্ত নিয়মকানুন কঠোর করায় রাজ্যের হিন্দু পশুপালকদের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন বিধিনিষেধ শুধু ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকেই উসকে দেয়নি, বরং গ্রামীণ বাংলার হাজার হাজার হিন্দু পশুপালক ও দুগ্ধ খামারিদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দুর্দশাকেও সামনে এনেছে।
আসন্ন ঈদুল আজহার আগে এই বিতর্কটি নতুন করে গতি পেয়েছে। সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমামসহ বিশিষ্ট মুসলিম আলেমগণ ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে মুসলমানদের গো-কোরবানি পরিহারের আবেদন জানান। একই সাথে, গ্রামীণ গবাদিপশু ব্যবসায়ী, যাদের একটি বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত, তারা বলছেন যে, গবাদিপশু জবাই ও পরিবহনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন গ্রামীণ অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে, যা তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবিকাকে সঙ্কটে ফেলেছে।
কঠোর নিয়মে গ্রামীণ বাজারে অনিশ্চয়তা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর এবং মহিষ জবাই করার আগে ‘ফিট সার্টিফিকেট’ (ঝষধঁমযঃবৎ ঋরঃহবংং ঈবৎঃরভরপধঃব) বাধ্যতামূলক করে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, শুধু ১৪ বছরের বেশি বয়সী গবাদিপশু অথবা আঘাত, রোগ, বিকৃতি বা বার্ধক্যের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষিত পশুই জবাইয়ের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কয়েক দশক পুরনো ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’-এর এই কঠোর প্রয়োগ গ্রামীণ গবাদিপশুর বাজারগুলোতে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বাংলার গ্রামীণ হিন্দু কৃষক পরিবারগুলো গবাদিপশুকে কেবল দুগ্ধ সম্পদ হিসেবেই নয়, আপৎকালীন আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবেও গণ্য করে। ঐতিহ্যগতভাবে, চাষাবাদের খরচ জোগাতে বা পারিবারিক প্রয়োজনে তারা দুধ না দেয়া গাভীগুলোকে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে নগদ অর্থ উপার্জন করত। এখন গবাদিপশু পরিবহনকে ঘিরে আইনি কড়াকড়ি, নজরদারি এবং গো-সুরক্ষা সংক্রান্ত সামাজিক উত্তেজনার কারণে গ্রামীণ হাট বা মান্ডিগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অর্থনৈতিক বোঝা বইছেন হিন্দু দুগ্ধ খামারিরা
নদীয়া জেলার একজন গবাদিপশু ব্যবসায়ী বলেন, “অধিকাংশ গ্রামবাসীর জন্য সমস্যাটি ধর্মীয় নয়, সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক। পশুখাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরির কারণে দুধ না দেয়া গবাদিপশু পালন করা খামারিদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আগে একটি নিয়ন্ত্রিত আইনি উপায়ে বয়স্ক গবাদিপশু বিক্রি করা যেত। এখন ভয় এবং অনিশ্চয়তা পুরো বাজারকে ধসিয়ে দিয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, বাংলার গ্রামীণ দুগ্ধ অর্থনীতি সচল রাখতে খামারিরা প্রায়শই জার্সি, হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান এবং সাহিওয়ালের মতো উন্নত জাতের গরুতে বিনিয়োগ করেন। ভারতে অন্যতম বৃহত্তম গবাদি পশুর সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে (আনুমানিক ১৬.৫ মিলিয়নেরও বেশি)। তা সত্ত্বেও রাজ্যটি দুধের ঘাটতিতে ভোগে। ১০টি গরু সংবলিত একটি ছোট খামার থেকে মাসে ১.২ থেকে ১.৫ লাখ টাকা আয় সম্ভব হলেও নিয়মিত খরচ আয়ের বড় অংশ কেড়ে নেয়। ফলে অনুৎপাদনশীল পশু পুনঃবিক্রয় করতে না পারলে খামারিরা দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
কোরবানিসংক্রান্ত কলকাতা হাইকোর্টের রায় ও আইনি বিতর্ক
এদিকে ঈদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গে ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষ যথাযথ সনদপত্র ছাড়া জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। একই সাথে আদালত অবলোকন করেছে যে, গরু কোরবানি ঈদুল আজহার কোনো বাধ্যতামূলক বা অপরিহার্য অংশ নয়।
হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শিবজ্ঞনম ও বিচারপতি পার্থ সারথী সেনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গত ১৩ মে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। আদালত উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের মে মাসে জারি করা বিজ্ঞপ্তিটি মূলত ২০১৮ সালের হাইকোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনারই ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। রাজ্য সরকারের ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছিল, ‘নাজুক’ ঘোষণা ও পশু চিকিৎসকের দেয়া উপযুক্ত ফিটনেস সনদপত্র ছাড়া কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না।
মামলায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য যুক্তি দেন যে, এই আইনটি মূলত কলকাতা ও নির্দিষ্ট কিছু পৌরসভার অবকাঠামোর জন্য তৈরি হয়েছিল, পুরো রাজ্যের গ্রামীণ বাস্তবতায় এটি প্রয়োগ করা জটিল। তবে কলকাতা পৌরসংস্থার আইনজীবী নীলোৎপল চ্যাটার্জি জানান, তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ জবাইখানা এবং সনদ দেয়ার জন্য নির্ধারিত কর্মকর্তা আছেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, পুরো রাজ্যে এই সনদ দেয়ার সঠিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সরকারের।
নীতিগত স্পষ্টতার দাবি
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের কাছে এমন একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন, যা ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতারও ভারসাম্য রক্ষা করবে। তারা সরকারি উদ্যোগে নিয়ন্ত্রিত গোশালা নির্মাণ, অনুৎপাদনশীল গবাদিপশুর জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা এবং বৈধ লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের আইনি সুরক্ষার দাবি তুলেছেন।



