নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের চলমান বিশৃঙ্খলা নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হলো ব্যাংকিং সেক্টর। অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য সুষ্ঠু ব্যাংক ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আমলে লুটপাট হয়ে যাওয়া ব্যাংকব্যবস্থা পুনর্গঠনের দিকে নজর না দিয়ে সরকার তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে। বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক কঠিন সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় সমন্বিত করেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। অনেক ব্যাংক ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং চরম তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করছে।
গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, গভর্নরের অযোগ্যতা ও সরকারের অযাচিত হস্তেেপ তাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমানতকারীরা সর্বস্ব হারিয়ে হাহাকার করছেন। সরকার এসব সঙ্কট নিরসন না করে কয়েকটি ব্যাংকে নিজস্ব লোকদের বসিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে এবং গ্রাহকদের মধ্যে অবিশ্বাস ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে আর্থিক খাতকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলছে, যা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি, দেশের রেমিট্যান্স আহরণে, আমদানি-রফতানিতে ও শিল্প-বাণিজ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নিয়েও চলছে বহুবিধ ষড়যন্ত্র। বৈধ এমডিকে জোরপূর্বক পদচ্যুত করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমি একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি অপসারণে সরকারি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, অযোগ্যদের পর্ষদে বসিয়ে সফল ব্যাংকটিকে স্থবির করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে তিন কোটি আমানতকারী এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮০ লাখ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীকে চরম হুমকির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা দেশের কর্মসংস্থানে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ রেমিট্যান্স আহরণ থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণকারী এই ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়লে আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের মর্যাদা মারাত্মকভাবে সঙ্কটে নিপতিত হবে। আমরা মনে করি, ইসলামী ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হলে পুরো ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার মতাগ্রহণের পরপরই একরকম মব সৃষ্টি করে দলের অনুগত এবং অনুকম্পা নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলকারী একজন মধ্যমসারির ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিযুক্ত করেছে। দলীয় আনুগত্য ছাড়া যার বিশেষ কোনো যোগ্যতা নেই।
তিনি বলেন, অবিলম্বে দলীয় গভর্নরকে অপসারণ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন পেশাদার ও আর্থিকখাতে দক্ষ কোনো ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ছুটি শেষে ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে ফিরিয়ে এনে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান বোর্ড ভেঙে দিয়ে যোগ্য, দক্ষ ও ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন বোর্ড গঠন করতে হবে। একইসাথে আর্থিক খাত ও ব্যাংকগুলোতে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশের আর্থিক খাতে যে অভিঘাত আসবে তা সামাল দেয়া সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সরকারকে এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হলে এবং আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তার দায় সরকারকেই বহন করতে হবে, যা কারো কাম্য নয়।
‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান এখন অস্পষ্ট’
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার রলেছেন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি এক ধরনের দ্বিধা ও সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। রাষ্ট্রের সংস্কার প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখন অস্পষ্ট হয়ে গেছে। আগে তারা যে সংস্কার, গণভোট ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কথা বলেছিল, এখন ক্ষমতায় আসার পর সেই অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সংসদে ও রাজপথে আন্দোলন করবে জামায়াত। আন্দোলনের মাধ্যমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে। গতকাল দুপুরে ঝালকাঠি শহরে জেলা জামায়াত আয়োজিত রুকন শিক্ষা শিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি আরো বলেন, জনগণের সামনে বিএনপি এখন নিজেদের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। তারা এখন সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জনগণ চেয়েছিল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সুশাসন ও ন্যায়বিচার। কিন্তু এখনো মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দেশে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ও সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
ঝালকাঠি জেলা জামায়াত ইসলামির আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে রুকন শিক্ষাশিবিরে আরো উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, বরিশাল অঞ্চলের টিম সদস্য মাওলানা ফখরুদ্দিন খান রাজী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ ফরিদুল হক ও নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট বি এম আমিনুল ইসলাম এবং গত সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ আসনের জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ড. ফয়জুল হক, ঝালকাঠি-২ আসনের শেখ নেয়ামুল করিম প্রমুখ।
চীনের কয়লাখনিতে নিহতদের জন্য শোক : চীনের উত্তরাঞ্চলে একটি কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে ৯০ জন নিহত ও অনেক আহতের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ২১ মে জুমাবার চীনের উত্তরাঞ্চলে একটি কয়লাখনি দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণে ৯০ জন নিহত এবং বহু আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই বিবৃতি লেখা পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন হতাহতকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আরো বলেন, এই দুর্ঘটনা দেশটির জন্য অনেক বড় ক্ষতি। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে হতাহতদের পরিবার-পরিজন ও আহতদের প্রতি এবং চীনের জনগণ ও দেশটির সরকারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি।
রামিসা হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেছেন, শিশু রামিসাকে শুধু ধর্ষণই করা হয়নি বরং নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড জাতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, দেশে ধারাবাহিকভাবে হত্যা, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চললেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
গতকাল রংপুরের পাগলাপীর স্কুল অ্যান্ড কলেজের হলরুমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর মহানগর শাখার সদস্য প্রার্থী ও অগ্রসর কর্মী শিক্ষা শিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ : রাজশাহী নগরীর মতিহার এলাকায় গৃহবধূ রিতু খাতুন রিয়াকে নির্যাতনের পর পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে স্বামী মিজানুর রহমান মিজানসহ জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে গত ২২ মে বিনোদপুরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। সেই মানববন্ধনের সংবাদে রিয়া খাতুনের স্বামী মিজানকে জামায়াত নেতা উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকটি অনলাইন গণমাধ্যমে, যা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. মাওলানা কেরামত আলী এমপি ও সেক্রেটারি মু ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, প্রকৃত ঘটনা হলো ওই এলাকার জামায়াতে ইসলামীর যুব সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মিজানুর রহমান, পিতা আব্দুস শুকুর ধরমপুর, মতিহার রাজশাহী পেশায় ইন্টারনেট ব্যবসায়ী। তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার রিয়ার কেউ নন। অভিযুক্ত ব্যক্তি রিয়ার স্বামী যাকে গ্রেফতারের দাবিতে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করেছেন, তিনি হলেন মো: মিজানুর রহমান ওরফে ব্যাটারি মিজান, পিতা : সুক্তার আলী, স্থানীয় বিএনপি নেতা ধরমপুর, মতিহার, রাজশাহী, পেশা- ব্যাটারি ও জমির ব্যবসায়ী, যার সাথে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।



