ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন, আজকের মধ্যে চার্জশিট দাখিল

দ্রুত বিচারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : আইনমন্ত্রী

Printed Edition
শিশু রামিসা হত্যা
শিশু রামিসা হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীর আলোচিত আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গতকাল শনিবার দুপুরে তারা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট থেকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁঁইয়া নিপুন ডিএনএ রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করা হয়। মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্টগুলো হাতে পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্র তৈরির কাজ চলছে। ফলে আজ রোববারের মধ্যেই এ মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা হতে পারে।

এ দিকে গতকাল ব্র্যাক সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামানও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিশু রামিসা হত্যা মামলায় ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট পাওয়া গেলে আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। সরকারের এই বিশেষ তৎপরতার কারণে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ডিএনএ রিপোর্ট ছাড়া চার্জশিট দিলে পরবর্তী সময়ে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ঈদের ছুটির পরপরই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে।

এ মামলায় গত বুধবার গ্রেফতার আসামি সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন। তিনি ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন। ওইদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির জবানবন্দী রেকর্ড করেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

জবানবন্দীতে সোহেল জানান, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যান। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করেন সোহেল। এর মধ্যে শিশু রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করেন তিনি। এরপর দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখেন। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান সোহেল। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি আদালতকে জানান, ভুক্তভোগীর পরিবারের সাথে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।

ঈদের আগেই রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিটের চেষ্টা : আইনমন্ত্রী

দেশজুড়ে আলোচিত রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরুর আগেই দাখিল করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ঈদের আগে যদি ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়া যায় এবং চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়, তবে ঈদের পরপরই এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। সরকার দ্রুততম সময়ে এই বিচার সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘আইনগত সহায়তায় সমন্বিত উদ্যোগ, দায়িত্ব ও বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা জানান। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতর এবং ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে।

রামিসা হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সাধারণত ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস সময় লাগলেও এই মামলার রিপোর্ট ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়ার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যমান আইনি বিধান নিখুঁতভাবে অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দাখিল করা হলে প্রসিকিউশনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি (ফ্যাটাল ইনজুরি) থেকে যেতে পারে। এই ধরনের মামলায় ডিএনএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। যেহেতু দেশে ডিএনএ পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে, তাই তা অবশ্যই সঠিকভাবে সম্পন্ন করা উচিত।

দ্রুত বিচারের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর বিচার শেষ করতে মাত্র এক মাস সময় লেগেছিল। এ ছাড়া ১৯৪৮ সালের মুলুক চাঁদ মামলায় এক দিনেই বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার নজির রয়েছে। রামিসা হত্যা মামলাটিও দ্রুততম সময়ে শেষ করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বিচার দ্রুত সম্পন্নে সরকারের আন্তরিকতার কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ এবং দেশ-বিদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশা পূরণে আমরা সক্ষম হব বলে আশা করি। যদি আমরা কোনো ভুল পথে এগিয়ে যাই, তবে আপনারা আমাদের সমালোচনা করবেন, গাইড করবেন। এ বিষয়ে আমাদের কোনো কার্পণ্য থাকবে না।’

দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের অংশ। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। একই সাথে তিনি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেও তা কার্যকর করতে উচ্চ আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

এ সময় নেত্রকোনায় এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাটি আইনমন্ত্রীর নজরে আনা হলে তিনি জানান, সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মনজুরুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদেম উল কায়েস। মুক্ত আলোচনায় ব্লাস্ট, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় বিশেষ পিপি নিয়োগ

পল্লবীতে নৃশংসতার শিকার শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে এক বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এই স্পর্শকাতর মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি বা বিশেষ পিপি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

আইন মন্ত্রণালয় থেকে এই নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এরই মধ্যে জারি করা হয়েছে। নবনিযুক্ত বিশেষ পিপি মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আদালতের সামনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের ডিজিটাল ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, অভিজ্ঞ এই আইনজীবীর তত্ত্বাবধানে মামলার বিচারিক কার্যক্রম কোনো প্রকার কালক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এই বিশেষ নিয়োগের মূল লক্ষ্য।

সোহেল রানা নাটোর যুবলীগের কর্মী ছিলেন

শিশু রামিসাকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার ৪ নং কলম ইউনিয়নে যুবলীগের কর্মী ছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা। তারা জানান, শেখ হাসিনার পতনের আগে সোহেল রানা কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলাম (মেম্বার) ও যুবলীগ নেতা রাকিব মণ্ডলের ডান হাত হিসেবে এলাকায় নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন। তখন নিজেকে সবার কাছে যুবলীগের কর্মী বলে পরিচয় দিতেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইউনিয়নের মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। সোহেল রানা ছোটবেলা থেকেই গ্রামে মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। কয়েক বছর যুবলীগের পরিচয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব করেন। একপর্যায়ে আত্রাই নদীর ওপর নির্মিত সেতুর নির্মাণ সামগ্রী ও রড চুরির মামলায় আসামি হয়ে জেলও খেটেছেন। যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার এমন অপকর্মের জন্য তার সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা-মা, বোনসহ পরিবারের সদস্যরাও। চার বছর আগে প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন।

রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে গাজীপুরে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি জানান, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দ্রুত বিচার এবং সারা দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজীপুর মহানগর মহিলা বিভাগ।

শনিবার সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীরা অংশ নেন। এ সময় ‘চুপ থাকব না, বিচার চাই’, ‘আর একটা রামিসা নয়’ এবং ‘শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত চাই’সহ নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজবাড়ী রোড এলাকা। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৭ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়, যা মানবতার জন্য চরম কলঙ্কজনক ঘটনা। বক্তারা বলেন, দেশে শিশুদের ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন- মহিলা জামায়াতের গাজীপুর মহানগর সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আমেনা বেগম, মহানগর সহকারী সেক্রেটারি মারুফা শহীদ ও নাজমুন নাহার লাভলী, মহানগর কর্মপরিষদ সদস্য ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগীয় সম্পাদিকা নাসরিন তাসনিয়া, কর্মপরিষদ সদস্য নাসরিন জাহান গুলশান ও খাতেমুন আরা মুক্তা, টঙ্গী পশ্চিম থানা দায়িত্বশীলা ও মহানগর শূরা সদস্য ফাহমিদা খাতুন লাকি। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গাজীপুর জেলা মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নাসরিন আকবর।

বক্তারা অবিলম্বে রামিসা হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি জানান। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশু সুরক্ষা টহল, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানান।

তারা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।