আলজাজিরার অনুসন্ধান
গাজায় চলমান গণহত্যার দুই বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সতর্কতা ও একাধিক দেশের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলে প্রবেশ করেছে। আলজাজিরার দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ইসরাইলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য, কাস্টমস রেকর্ড এবং তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে পরিচালিত এই তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সামরিক পণ্যের মোট দুই হাজার ৬০৩টি চালান ইসরাইলে প্রবেশ করেছে। এসব পণ্যের মোট ঘোষিত মূল্য ছিল ৩২২ কোটি শেকেল বা প্রায় ৮৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর ৯১ শতাংশই এসেছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইসিজের রায়ের পরে।
শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী দেশ
যুদ্ধকালে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যারা মোট সামরিক আমদানির ৪২ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত, যার অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ। কাস্টমস নথিতে দেখা গেছে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান কল্যাণী রাফায়েল অ্যাডভান্সড সিস্টেমস থেকে ইসরাইলের রাফায়েল ডিফেন্স সিস্টেমসে পাঁচ লাখ ৫৪হাজার ১২০টি ভারী ফ্র্যাগমেন্টেশন উপাদান, ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেলের ৫০টি খোল এবং ৯৯ হাজার ৪০০টি বিস্ফোরক বুস্টার পেলেট রফতানি করা হয়েছে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ সরবরাহকারী রোমানিয়া, যার অংশ মোট আমদানির ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে এককভাবে সর্ববৃহৎ চালান পাঠিয়েছে দেশটি, বিস্ফোরক অস্ত্রের এই চালানের মূল্য ছিল দুই কোটি আট লাখ শেকেল বা ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার। চতুর্থ স্থানে তাইওয়ান (৪ শতাংশ) এবং পঞ্চম স্থানে চেক প্রজাতন্ত্র (৩ শতাংশ)। ২০২৪ সালের মে মাসে চেক প্রজাতন্ত্র তাদের সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি করেছে - এক কোটি পাঁচ লাখ শেকেল বা ২৯ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক পণ্য।
ইউরোপীয় দেশগুলোর চিত্র
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিলিতভাবে মোট আমদানির প্রায় ১৯ শতাংশ সরবরাহ করেছে।
জার্মানি- ইউরোপে ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দেশ পুরো যুদ্ধকালে ১০০টি চালানে প্রায় চার কোটি ৩৫ লাখ শেকেল বা এক কোটি ২০ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য সরবরাহ করেছে। চ্যান্সেলর মার্জ ২০২৫ সালের আগস্টে রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেন, কিন্তু তখন ইতোমধ্যে বেশির ভাগ রফতানি হয়ে গেছে। ঘোষণার এক মাস পরও ২৯ লাখ ডলারের চালান বেন গুরিয়ান বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
ফ্রান্স- মোট চার কোটি ৯৯ লাখ শেকেল বা এক কোটি ৩৭ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য রফতানি হয়েছে, যার ৯২ শতাংশই আইসিজের রায়ের পরে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ২০২৪ সালের অক্টোবরে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানালেও পরেও ২৫টি চালান ইসরাইলে পৌঁছায়।
ইতালি- ৯৮টি চালানে মোট দুই কোটি ৪০ লাখ শেকেল বা ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য সরবরাহ করা হয়। অস্ত্র স্থগিতের ঘোষণার পরও আরো ৩৩টি চালান ইসরাইলে পৌঁছায়, যার মূল্য ছিল ৫১ লাখ শেকেল।
স্পেন- স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কোনো অস্ত্র বিক্রি হয়নি। কিন্তু ইসরাইলের কাস্টমস তথ্য বলছে ভিন্ন কথা- ৯৯টি চালানে দুই কোটি ১৬ লাখ শেকেল বা ৫৯ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য স্পেন থেকে ইসরাইলে গেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এককভাবে ৪০ লাখ শেকেল মূল্যের বিস্ফোরক ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়।
যুক্তরাজ্য- ২৮টি চালানে ৬৭ লাখ শেকেল বা ১৮ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য ইসরাইলে পাঠানো হয়েছে। ২৯টি লাইসেন্স স্থগিত করা হলেও প্রায় ৩৫০টি সক্রিয় ছিল। ২০২৫ সালের জুনে ১৯ লাখ শেকেল বা পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ডলারের একক চালান পাঠানো হয়, যা ২০২২ সাল থেকে বিশ্লেষণ করা তথ্যে সর্ববৃহৎ একক চালান। তদুপরি, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালি হয়ে রফতানির জন্য কোটি কোটি পাউন্ডের অতিরিক্ত লাইসেন্স অনুমোদন দেয়া হয়।
বুলগেরিয়া- ২০২৪ সালের মে মাসে দুই কোটি এক লাখ শেকেল বা ৫৫ লাখ ডলার মূল্যের বিস্ফোরক অস্ত্রের বৃহত্তম একক চালান পাঠিয়েছে। নেদারল্যান্ডস- যুদ্ধের আগে ২০২২ সালের আগস্টে একাই চার কোটি চার লাখ শেকেলের সামরিক পণ্য পাঠালেও যুদ্ধকালে এই পরিমাণ নেমে আসে মাত্র এক লাখ পাঁচ হাজার শেকেলে।
কানাডা ও ব্রাজিল
কানাডা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নতুন রফতানি অনুমোদন বন্ধের ঘোষণা দেয়, মার্চে সংসদীয় ভোটের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিক করা হয়। তবে এরপরও ১৯টি সামরিক চালান ইসরাইলে পৌঁছায়। মোট ২৩টি চালানে প্রায় ১৭ লাখ শেকেল বা চার লাখ ৫৮ হাজার ডলার মূল্যের সামরিক পণ্য সরবরাহ হয়েছে।
ব্রাজিল আইসিজের রায়কে আইনগতভাবে বাধ্যবাধক বলে উল্লেখ করে পূর্ণ মেনে চলার আহ্বান জানালেও দেশটি থেকে যুদ্ধকালে মোট ৮৭ লাখ শেকেল বা ২৪ লাখ ডলারের সামরিক চালান ইসরাইলে পৌঁছেছে, যার ৮০ শতাংশ এসেছে আইসিজের রায়ের পরে।
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মোট আমদানির প্রায় ৮ শতাংশ এসেছে। চীন আইসিজের রায় কার্যকর করার আশা প্রকাশ করলেও দেশটি থেকে যুদ্ধকালে সাত কোটি ১১ লাখ শেকেল বা এক কোটি ৯৬ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য ইসরাইলে গেছে। এর প্রায় ৮৩ শতাংশ এসেছে আইসিজের রায়ের পরে।
সিঙ্গাপুর আইসিজের আদেশকে ‘বাধ্যবাধক’ বলে স্বীকার করে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও দেশটি থেকে দুই কোটি দুই লাখ শেকেল বা ৫৬ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য গেছে, যার ৮৮ শতাংশ রায়ের পরে।
দক্ষিণ কোরিয়া- ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ হিসেবে এক কোটি ৪০ লাখ শেকেল বা ৩৮ লাখ ডলারের বৃহত্তম একক চালান পাঠায়। সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কথা বললেও দেশটি থেকে ৯০ লাখ শেকেল বা ২৫ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য ইসরাইলে গেছে। এর ৯৮ শতাংশই এসেছে আইসিজের রায়ের পরে। সুইস সরকার স্বীকার করেছে, নির্দিষ্ট কিছু সামরিক পণ্যের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল।
তুরস্ক- প্রেসিডেন্ট এরদোগান গাজায় ইসরাইলের হামলার কড়া সমালোচনা করলেও তুরস্ক থেকে ৭৫ লাখ শেকেল বা ২১ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য ইসরাইলে গেছে, যার ৭৯ শতাংশ আইসিজের রায়ের পরে। তুরস্ক ২০২৪ সালের মে মাসে সম্পূর্ণ বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দেয়। আশদোদ বন্দর দিয়ে প্রবেশ সেসময় বন্ধ হলেও বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর ও হাইফা বন্দর দিয়ে তুর্কি পণ্য আসতে থাকে।
আজারবাইজান - যুদ্ধের আগে বিস্ফোরক অস্ত্রের শীর্ষ সরবরাহকারীদের মধ্যে ছিল। যুদ্ধের আগের ২০ মাসে এককভাবে আট কোটি ৯ লাখ শেকেলের পণ্য পাঠালেও যুদ্ধকালে এই পরিমাণ কমে ৮২ লাখ শেকেলে নেমে আসে।
যুদ্ধবিরতিতে ছিল সবচেয়ে বড় চালান
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কিছু অস্ত্রের চালান ইসরাইলে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইফা বন্দরে ৬০ কোটি ৫০ লাখ শেকেল বা এক কোটি ৬৬ লাখ ডলারের একটি একক চালান আসে, যা পুরো তদন্তে চিহ্নিত সর্ববৃহৎ একক অস্ত্র আমদানি। চালানটি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ ছিল।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দেশগুলো গণহত্যায় সহযোগিতার আন্তর্জাতিক আইনি দায় এড়াতে পারবে না। জাতিসঙ্ঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্ত দেয় যে ইসরাইল গাজায় গণহত্যা সংঘটন করেছে এবং রাষ্ট্রগুলো গণহত্যামূলক কাজে ব্যবহৃত বা সম্ভাব্যভাবে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হস্তান্তর বন্ধে বাধ্য।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নেভে গর্ডন বলেন, ‘একটির পর একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ভেঙে ফেলছে। যেসব রাষ্ট্র এই আইনি কাঠামো গড়েছিল এবং সবসময় এর উদ্ধৃতি দেয়, তারাই এখন এর ধ্বংসে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখছে।”
যুদ্ধবিরতির পরেও চালান থামেনি। ২০২৫ সালের শেষ দুই মাসে ২৮টি দেশ থেকে আরো ২২০টিরও বেশি চালানে ৩২৫ কোটি শেকেলের সামরিক পণ্য ইসরাইলে পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে ইসরাইল আরো ৮০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।



