নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতীয় হেজেমনি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি, এই হেজেমনি মোকাবেলায় বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সরকারকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, এ ধরনের সাহস গত ৫০ বছরেও আমাদের দেশে কেউ দেখাতে পারেনি। এ ছাড়া পাঁচ-ছয় বছর আগে সীমান্তে নেপালের নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর সে দেশের জনগণ এমন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপালিদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। ভারতীয় হেজেমনি মোকাবেলায় জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে। গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ফ্রেন্ডস অব হিউম্যানিটির আয়োজনে ‘ভারতে মুসলিম নির্যাতন : রাজনীতি, পরিচয় ও সংখ্যালঘু অধিকার দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বিশ্বে ইসরাইল, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত- এই তিনটি দেশ একযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। ইরান আক্রমণের দুই দিন আগে সফরে গিয়ে ইসরাইলকে নিজের ফাদারল্যান্ড এবং সপ্তাহখানেক আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে সে দেশকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বলে ঘোষণা দেন নরেন্দ্র মোদি। এই তিনটি দেশ পরস্পর যোগ সাজসে বিশ্বে অ্যান্টি মুসলিম ভূমিকা পালন করছে। বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছরে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, সুশীল বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া বয়ান সৃষ্টি করেছিল ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের বিষয়টি ভুল ছিল। তিনি সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন নিয়ে বলেন, যারা এমন বয়ানে বিশ্বাসী তারা দেশের শত্রু ও ভারতে দালাল তিনি। যারা এখনো এমন বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করছেন তাদের আজকের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম প্রদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়; যার বেশির ভাগেই ছিল মুসলিম ভোটার। চরম হিন্দুত্ববাদী বিজিপি পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলে নিতে মুসলিমদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়।
মাহমুদুর রহমান বলেন, ভারতের বিজিপির উত্থান ও মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা এবং জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের উত্থানের তথ্য তুলে ধরে যারা এগুলো সমান্তরাল বিষয় বলে বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করছেন তারা মূলত ভারতের দালাল। ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে আমরা চুপ থাকতে পারি না। কেননা, ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বাংলাদেশ বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমাদের চুপ থাকার সুযোগ নেই। এ জন্য তিনি দেশের জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সরকারকে ভারতের হেজেমনির মোকাবেলায় নিজেদের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জনগণকে চোরাচালান বন্ধে ভূমিকা রাখতে এবং অন্য অঞ্চলের জনগণকে ভারতীয় পণ্য বয়কটের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ হলে মাদক আসাও বন্ধ হয়ে যাবে। মাদক আমাদের সমাজে এক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে; যার কারণে নৃশংস ঘটনাও ছড়িয়ে পড়ছে। চোরাচালান বন্ধ হলে আমাদের সমাজের অনেক সামাজিক ব্যাধি দূর হয়ে যাবে।
জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা ভারতীয় গরু কিনে কোরবানি দিবেন না, গরুসহ ভারতীয় সব পণ্য বর্জন করুন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ভারতীয় হেজেমনি মোকাবেলায় এই দাবিগুলো নিয়ে রাস্তায় নামারও আহ্বান জানান তিনি।
রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা দেখে বিস্মিত হই; কারণ এনসিপি ছাড়া আর কোনো দলকে ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে না। কেননা, রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় আসা কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। এই ভাইরাস দূর হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরে গিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সময় চাইলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়; তাকে সময় দেয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী মোদি আসলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সেমিনারে শিক্ষাবিদ মো: শাহ আলম তার প্রবন্ধে ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরেন।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান ড. খন্দকার রাশেদুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মো: শাহ আলম। সেমিনারে বক্তব্য শিক্ষাবিদ ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্স ল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার অ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. শাজাহান খান, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর মনজুর মাহমুদ, ইতিহাসবিদ জিয়া-উল-হক, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সাবেক সেনাকর্মকর্তা ড. ব্রিগেডিয়ার (অব:) হাসিনুর রহমান (বীর প্রতীক), সাবেক অতিরিক্ত সচিব ডা: ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক শাহ আব্দুল হালিমসহ বিশিষ্টজনেরা।



