অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
অবশেষে প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা ঈদ-পরবর্তী পুঁজিবাজার নিয়ে যে ভালো প্রত্যাশার কথা বলছেন, তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যেন এখনো মিলছে। গতকাল নিয়ে টানা চার দিন দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি ঘটল। গত দুই দিনেই ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ১০৫ পয়েন্টের বেশি। এ সময় বাজারটিতে লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি দর বেড়েছে বেশির ভাগ কোম্পানির।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির কারণে সরকারি আদেশে গতকাল শনিবার ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খোলা ছিল। এ দিন লেনদেনের শুরুতেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ বিনিয়োগকারীদের বাজারে অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তোলে। ফলে লেনদেনের পুরোটা সময় বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সাবলীল আচরণ দেখা যায়। ব্যাংক, বীমাসহ প্রায় সব খাতে বেশির ভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি এগিয়ে নিয়ে যায় বাজার সূচককে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার শনিবার বন্ধ থাকছে। সে হিসাবে গতকাল কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। এটিও বিনিয়োগকারীদের মানসিকভাবে কিছুটা উজ্জীবিত করে। তা ছাড়া ঈদ-পরবর্তী একটি ভালো বাজারের প্রত্যাশা তো আছেই। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো; যা দিনশেষে লেনদেনও সূচকের উন্নতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৬৪ দশমিক ২৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে ৫ হাজার ২৬৪ দশমিক ১২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩২৮ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে। একই সময় পুঁজিবাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৯৮ ও ৭ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৬১ দশমিক ০৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে গতকাল। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২০৮ দশমিক ২৬ ও ৯৬ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।
এ দিকে তালিকাভুক্ত তিন কোম্পানির বিরূদ্ধে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত নগদ লভ্যাংশ পরিশোধে ব্যর্থতা, আর্থিক প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানসহ বিভিন্ন সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিগুলোর মধ্যে আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরূদ্ধে যথাক্রমে এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা ও এক কোটি ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্য দিকে জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসির চেয়ারম্যানসহ আটজনকে মোট আট লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
১৯ মে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১০১৪তম কমিশন সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২১ মে কমিশনের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিএসইসি প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, আফতাব অটোমোবাইলস ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল। ঘোষিত মোট সাত কোটি ৪৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৬৪ টাকার লভ্যাংশের মধ্যে কোম্পানিটি ছয় কোটি ২৯ লাখ ১৩ হাজার ৮১৪ টাকা ৩৩ পয়সা পরিশোধ করলেও অবশিষ্ট এক কোটি ১৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৪৯ টাকা ৬৭ পয়সা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় কমিশন নির্দেশনা দিয়েছে যে, আদেশ জারির পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে অবণ্টিত ক্যাশ ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীদের পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড কার্যকর হবে এবং সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে তা আদায় করা হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আফতাব অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলামকে ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া পরিচালক খালেদা ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম ও ফারহানা ইসলামকে ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। একই সাথে তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তাকে (সিএফও) ১০ লাখ টাকা এবং কোম্পানি সেক্রেটারিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
কমিশন আরো জানিয়েছে, এসব জরিমানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দায় হিসেবে গণ্য হবে। নির্ধারিত সময়ে জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড আরোপ করা হবে। পাশাপাশি এ জরিমানার ফলে অবণ্টিত ডিভিডেন্ড পরিশোধের দায় থেকে কোম্পানি অব্যাহতি পাবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
অন্য দিকে জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসি ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের দিতে ব্যর্থ হয়। বিষয়টি সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘনের শামিল হওয়ায় কোম্পানির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জেনেক্স ইনফোসিসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমাম, অ্যাক্টিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহজালাল উদ্দিন, পরিচালক চৌধুরী ফজলে ইমাম, প্রিন্স মজুমদার, ওরাকল সার্ভিসেস পিএলসি ও নিলুফার ইমামকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। একই সাথে তৎকালীন সিএফও ও কোম্পানি সেক্রেটারিকেও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট আটজনের বিরুদ্ধে মোট আট লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ ছাড়া খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড আরোপ করেছে বিএসইসি। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনামুল কবির খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খান, পরিচালক মো: রুহুল কবির খান, হজরত আলী ও জারিন কবির খান প্রত্যেককে ২৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো: আজিজুল জব্বারকে ১০ লাখ টাকা এবং কোম্পানি সচিব তাপস কুমার সরকারকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে কোম্পানিটির সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিএসইসি বলছে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশন ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।



