ফের ধারাবাহিক পতনের শিকার পুঁজিবাজার

তিতাস গ্যাসের ২৮৩ কোটি টাকা মূলধন বাড়াতে সম্মতি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আবার পতনের ফাঁদেই আটকা পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই কমবেশি সূচক হারাচ্ছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গতকাল সোমবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সূচকের অবনতি ঘটে দুই বাজারে। অন্যান্য দিনের মতো গতকালও বাজারগুলো ভালোভাবে দিনের শুরু করলেও খুব বেশি সময় তা ধরে রাখতে পারেনি। সকাল ১১টার পরই বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেলে পতন ঘটে সূচকের। মাঝখানে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সাময়িকভাবে পতন সামলে নিলেও শেষ দিকে এসে বিক্রয়চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এতে দিনশেষে উভয় বাজারেই সব সূচকের অবনতি ঘটে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবই পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে দিচ্ছে না। ইতোমধ্যেই দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যে। এটি মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতেও। আর অর্থনীতির একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার। ফলে পুঁজিবাজার এ প্রভাব থেকে কিছুতেই মুক্ত থাকতে পারে না।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৫ দশমিক ০৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৪৭ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২৩২ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৩০ ও ২ দশমিক ৫১ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ২১ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট পতনের শিকার হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৯৯ ও ৯ দশমিক ২৭ পয়েন্ট।

গতকাল লেনদেনের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে বড় ধরনের বিক্রয়চাপে পড়ে বাজারগুলো। ঢাকা বাজারে সকালে লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মাথায় প্রধান সূচকটির ২০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটে। পরে বিক্রয়চাপে পড়ে সূচক নি¤œমুখী আচরণ করতে শুরু করে।

বেলা ১১টার পর এ চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। দুপুর ১২টার ডিএসই সূচক নেমে আসে ৫ হাজার ২২৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির অবনতি রেকর্ড করা হয় ২৪ পয়েন্টের বেশি। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সূচকটি ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়। দুপুর ১টার দিকে সূচকের কিছুটা উন্নতি ঘটে। কিন্তু এ সময় নতুন করে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে শেষ দিকে এসে সূচক হারায় বাজারটি।

সূচকের অবনতি সত্ত্বেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজার লেনদেনের আগের গতি ধরে রাখে। বাজারটি ৮২৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে গতকাল যা আগের দিন অপেক্ষা ৫ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮১৯ কোটি টাকা। তবে লেনদেন হ্রাস পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৪১ কোটি টাকা থেকে ৩৪ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।

এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রায় ২৮৩ কোটি টাকা মূলধন বৃদ্ধির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিভিন্ন সময়ে সরকারের থেকে নেয়া ঋণের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু করে এ মূলধন বাড়াবে কোম্পানিটি। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

কোম্পানিটি জানায়, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সভায় ইরিডিমেবল ও নন-কিউমুলেটিভ বৈশিষ্ট্যের প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন দেন শেয়ারহোল্ডাররা। ওই সভায় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অনুকূলে অভিহিত মূল্য ১০ টাকা করে মোট ২৮ কোটি ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ৪৬৯টি প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

কোম্পানিটি আরো জানায়, তাদের ইজিএমে পাস হওয়া সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন গত ১৫ এপ্রিল প্রস্তাবটিতে সম্মতি দিয়েছে। ফলে উল্লেখিত সংখ্যক শেয়ার ইস্যু করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অনুকূলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ২৮২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বাড়ানো হবে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। ৩২ কোটি ৭১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৯ কোটি ২২ লাখ টাকায় ৯২ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিটি ব্যাংক। এ দিন ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিলস, একমি পেস্টিসাইডস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ইভিন্স টেক্সটাইলস, লাভেলো আইসক্রিম, সায়হাম কটন মিলস, মীর আকতার হোসাইন ও স্যালভো কেমিক্যালস।

ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের কোম্পানি নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের ইভিন্স টেক্সটাইলস। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসই্র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স স্পিনিং, বিডি অটোকারস, আমান ফিড, প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, একমি পেস্টিসাইডস, দেশবন্ধু পলিমার ও লাভেলো আইসক্রিম।

দিনের দরপতনের শীর্ষ তালিকার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ দর হারিয়ে দরপতনের শীর্ষে ছিল হামিদ ফেব্রিক্স। ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ফার ইস্ট ফিন্যান্স। দরপতনে ডিএসই্র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং, পিপল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফিন্যান্স, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বিআইএফসি ও প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।