ইসলামী ব্যাংক খাতে নতুন অস্থিরতার শঙ্কা

লুটেরাদের পুনঃপ্রবেশের চেষ্টা

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশের ইসলামী ব্যাংক খাত আবারো এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক, অনিয়ম ও মালিকানা পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা পার করা এই খাতে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হাসিনার আমলে ব্যাংক লুটেরা, চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর সম্ভাব্য পুনঃপ্রবেশের গুঞ্জন। এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের (আইবিবিএল) পরিচালনা পর্ষদ থেকে আমানতকারীদের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত একমাত্র পরিচালককে অপসারণের ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক ও করপোরেট উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন কঠিন সময় পার করে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, তখন নতুন করে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা পুরো খাতকে আবারো ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংক লুটেরাদের আনাগোনা : পুরনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি?

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ইতিহাসে এস আলম গ্রুপের নাম একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। অতীতে এই গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের সময় ব্যাপক ঋণ অনিয়ম, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত এ শিল্পগোষ্ঠী একে একে ৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলে নেয়। তখনকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকগুলো দখলে নেয়। ব্যাংকগুলো দখলে নিয়ে নামে বেনামে পানির মতো অর্থ বের করে নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৫ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়। এভাবে ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯ কোটি টাকা নামে বেনামে বের করে নেয়। ব্যাংকগুলো থেকে টাকা বের করে নেয়ায় এখন একমাত্র ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (আইবিবিএল) বাদে বাকি ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকগুলো এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করে। এর পর একে একে ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাটের চিত্র বের করতে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু হয় ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার লড়াই। ইসলামী ব্যাংকের চৌকস কর্মকর্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খুব অল্প সময়ে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পরও গ্রাহক আস্থার কারণে ব্যাংকটি ঘুড়ে দাঁড়ায়। রেমিট্যান্স আহরণ, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ সার্বিক অবস্থায় শীর্ষ অবস্থানে থেকে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে অবদান রাখছে। কিন্তু অন্য ব্যাংকগুলো আর ঘুড়ে দাঁড়াতে পারেনি। এমন ৫টি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে কার্যক্রম শুরু করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, এস আলম গ্রুপ আবারো ইসলামী ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ হয়নি, তবুও খাত-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, একবার কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিলে তা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সত্যিই এমন কোনো পুনঃপ্রবেশ ঘটে, তা হলে ইসলামী ব্যাংকের ওপর আবারো আস্থা সঙ্কট তৈরি হতে পারে। আমানতকারীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হলে তা পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিচালক অপসারণ : শাসন কাঠামোয় নতুন পরিবর্তন

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত একমাত্র পরিচালককে অপসারণের ঘটনা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ সুশাসন প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অন্যরা এটিকে রাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। এই অপসারণের ফলে ব্যাংকের বোর্ডে নতুন করে শক্তির বিন্যাস তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, কোনো নতুন গোষ্ঠী যদি প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তা হলে এই শূন্যস্থান তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগ্রাম : টিকে থাকার লড়াই

গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক কঠিন সময় পার করেছেন। মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ কেলেঙ্কারি, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা- সব মিলিয়ে ব্যাংকটির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। ব্যাংকের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা বলছেন, তারা দিনরাত পরিশ্রম করে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। শাখা পর্যায়ে গ্রাহকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা এবং সেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন ব্যাংকের ওপর বাহ্যিক প্রভাব কম থাকবে এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে। অন্যথায়, আবারো যদি কোনো বিতর্কিত গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ নেয়, তা হলে কর্মকর্তাদের এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।

আমানতে ধাক্কা : জানুয়ারির চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। জানুয়ারি শেষে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকায়, যা ডিসেম্বর মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। যদিও এক বছরের ব্যবধানে আমানত ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে, তবে মাসিক ভিত্তিতে এই পতন খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোট আমানতের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ১০টি ইসলামী ব্যাংকের আমানত ৪ লাখ ৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখায় ৪২ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা এবং ইসলামী উইন্ডোতে ২৬ হাজার ১০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় অনেক গ্রাহক তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন, যা সামগ্রিক আমানত কমিয়ে দিচ্ছে।

বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স : মিশ্র চিত্র

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমানে ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরের তুলনায় সামান্য কম (১৭৬ কোটি টাকা)। তবে বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ ১১ শতাংশ বেড়েছে, যা খাতটির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অন্য দিকে, রেমিট্যান্স আহরণে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জানুয়ারি মাসে ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। একই সময়ে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো- আমদানি কার্যক্রম ১৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতিশীলতা নির্দেশ করে।

আস্থা সঙ্কটের ঝুঁকি : ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই আস্থা সঙ্কট একাধিকবার দেখা গেছে, এবং প্রতিবারই তা পুরো খাতকে প্রভাবিত করেছে। যদি আবারো কোনো বিতর্কিত গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের খবর ছড়ায়, তা হলে আমানতকারীরা দ্রুত তাদের টাকা তুলে নিতে পারেন। এতে তারল্য সঙ্কট তৈরি হতে পারে, যা ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা : এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কোনো বর্গি গোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকের মালিকানা ছেড়ে দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। অতীতে এমন ঘটনার জের হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও পতিত সরকারের পতনের সাথে সাথে পালিয়ে যান দায়িত্ব বুঝে না দিয়েই। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা আনা এবং ঋণ অনিয়ম রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে কিছু ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাতকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক খাত বর্তমানে একটি সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। এক দিকে রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, অন্য দিকে রয়েছে পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। ব্যাংক লুটেরাদের সম্ভাব্য পুনঃপ্রবেশের গুঞ্জন, পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন এবং আমানত হ্রাস, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, ইসলামী ব্যাংক শুধু নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাত, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। কিন্তু বারবার বিতর্ক, অনিয়ম এবং প্রভাব বিস্তারের কারণে এই খাতের স্থিতিশীলতা বিঘিœত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তা হলে ভবিষ্যতে আরো বড় সঙ্কট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, কোনো বিতর্কিত গোষ্ঠীর পুনঃপ্রবেশ যদি বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তা হলে ইসলামী ব্যাংকের জন্য তা হতে পারে আরেকটি বড় ধাক্কা, যা হয়তো এবার আর সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।