নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালী খোলা নিয়ে চুক্তি অথবা আরেকটি যুদ্ধ- এই দুই পথের মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতি এখন চূড়ান্ত মুহূর্তে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান সফর এবং কাতারের জরুরি মধ্যস্থতা দল প্রেরণের মধ্য দিয়ে আলোচনায় নতুন গতি এসেছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো “গভীর ও উল্লেখযোগ্য”। একই সময়ে মার্কিন গণমাধ্যম জানাচ্ছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের ছেলের বিয়েতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তও ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতি ক্রমেই সঙ্কটজনক মোড় নিচ্ছে।
এ দিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত শুক্রবার তেহরানে পৌঁছান এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক করেন। আরাকচির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত বার্তায় বলা হয়, তারা “উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক উদ্যোগের সর্বশেষ অবস্থা” নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এ ছাড়া মুনির ইরানের সংসদ স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সাথেও বৈঠক করেন।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই সতর্কতার সুরে বলেন, মুনিরের সফরের অর্থ এই নয় যে “কোনো টার্নিং পয়েন্ট বা চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে পৌঁছানো গেছে”। তিনি স্পষ্ট করেন যে, মধ্যস্থতায় আলোচনায় “গভীর ও উল্লেখযোগ্য” মতপার্থক্য এখনো বিদ্যমান।
আলজাজিরার তেহরান প্রতিনিধি রেসুল সেরদার আতাস অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তার মতে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের তেহরান সফর নিজেই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তিনি জানান, আরাকচি এই সময়ে তুরস্ক, ইরাক, কাতার ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে এবং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সাথে পৃথক ফোনালাপ করেছেন।
কাতারের জরুরি মধ্যস্থতা
এরই মধ্যে কাতার তেহরানে একটি মধ্যস্থতা দল পাঠিয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিনিময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও জমাট সম্পদ মুক্তির বিষয়ে আলোচনা একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথমে হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হবে। এরপর ৩০ দিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলবে। এই কাঠামোয় কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সেই দাবি পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে, যেখানে ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে বলা হয়েছিল।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই নেতা আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং পাকিস্তান পরিচালিত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৌশলগত জলপথ রক্ষা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি বলেন, কাতার ও পাকিস্তান উভয়ই এই মধ্যস্থতায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে। কারণ তাদের উভয় পক্ষের সাথেই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, বিকল্প হলো আরো যুদ্ধ আর কেউ সেটা চায় না।
নতুন হামলার জল্পনা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে তিনি ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না এবং ‘সরকারি পরিস্থিতি’ সংক্রান্ত কারণে ওয়াশিংটনে থাকবেন। এই ঘোষণা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে যে পরিস্থিতি হয়তো একটি স্পর্শকাতর মুহূর্তে প্রবেশ করেছে।
ট্রাম্প নিজেও এই সপ্তাহের আলোচনাকে “নতুন হামলা ও চুক্তির মাঝামাঝি সীমারেখায়” বলে বর্ণনা করেছেন। একই সময়ে মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও সিবিএস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে, তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ইরানের জাতিসঙ্ঘ মিশন এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত দাবি’ উত্থাপনের অভিযোগ তুলে বলেছে, এটি শান্তি আলোচনাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পারমাণবিক ছাড়ে রাজি ইরান, তবে শর্তসাপেক্ষ
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি জানান, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে রাজি এবং এর ঐতিহাসিক নজিরও রয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমিত রেখেছিল- যে মাত্রায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ব্যাপক পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছিল।
তবে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট : পারমাণবিক ক্ষেত্রে ছাড়ের বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ সম্পদ মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। ইজাদির ভাষায়, তেহরানের কাছে এগুলো গৌণ বিষয় নয়, এগুলো যেকোনো চুক্তির কেন্দ্রীয় শর্ত।
অন্য দিকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক কড়া ভাষায় বলেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানের অধিকার স্বীকার না করে, তাহলে ট্রাম্পকে আরো ‘পরাজয়’ মেনে নিতে হবে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ও কূটনীতিতে উভয় ক্ষেত্রেই এই সঙ্ঘাত থেকে বেরোনোর একমাত্র পথ হলো ইরানি জনগণের দাবি পূরণ করা।
হরমুজ প্রণালীর সঙ্কট ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান-মার্কিন সঙ্ঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে। এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও প্রণালীটি এখনো উন্মুক্ত হয়নি এবং পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে রয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের সমন্বয় ও নিরাপত্তায় তেল ট্যাঙ্কার, কনটেইনার জাহাজসহ কমপক্ষে ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।
ন্যাটো বৈঠকেও প্রণালীর বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। সুইডেনে অনুষ্ঠিত দু’দিনের ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে মহাসচিব মার্ক রুট বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং প্রণালীটি মুক্ত রাখতে দেশগুলোকে একত্র হওয়া প্রয়োজন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ন্যাটো মিত্ররা একমত যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে দেয়া যাবে না, তবে সঙ্কটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে খুব কম দেশই এগিয়ে এসেছে। তিনি স্পেনের সমালোচনা করেন কারণ দেশটি ইরান সংক্রান্ত অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনীকে নিজের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করেছে।
কাউন্সিল ফর অ্যারাব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক ক্রিস ডয়েল মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের বার্তায় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও দুই পক্ষই নিজ নিজ দেশের দর্শকদের বলছিল “আমরা জিতব, প্রতিপক্ষকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে।” সেই উত্তেজনা এখন কিছুটা কমেছে এবং দুই পক্ষই সম্ভবত আরো গুরুত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।
ডয়েল বলেন, উভয় পক্ষেই ক্লান্তি ঢুকছে। তারা জানে এভাবে চলতে পারে না। যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তিতে উভয় পক্ষকে এমন কিছু পেতে হবে যা তারা নিজ নিজ দেশে জনগণের সামনে বলতে পারবে - “এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ বিপর্যয় ছিল না, আমরা কিছু পেয়েছি।” তার স্পষ্ট বার্তা, “আমরা একটি ভাঙনের বিন্দুতে পৌঁছেছি - হয় কোনো না কোনো চুক্তি হবে অথবা আবার যুদ্ধ শুরু হবে।”
সব মিলিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের দিকে নিবদ্ধ। আগামী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনীতির পথে সমাধান আসবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি ভয়াবহ সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে।



