বিদেশী শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বৃদ্ধি ফ্রান্সজুড়ে ক্ষোভ

Printed Edition

প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে প্রতিনিধি

ফ্রান্স সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশগুলো থেকে উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে, সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি ডিক্রির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই নতুন নীতি কার্যকর হবে। সরকারের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারে ফ্রান্সকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে এবং উচ্চমানের বিদেশী শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি বৈষম্যমূলক এবং আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার পথ আরো কঠিন করে তুলবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকে ফ্রান্সে আসা বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে লাইসেন্স বা ব্যাচেলর পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৮৯৫ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। বর্তমানে এই ফি মাত্র ১৭৮ ইউরো। একইভাবে মাস্টার্স পর্যায়ে টিউশন ফি ২৫৪ ইউরো থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৪১ ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে। ফরাসি উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত সরকারের “উচ্চ শিক্ষার জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিন” পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করছেন। সরকারের দাবি, বিশ্বের অন্যান্য অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশের মতো ফ্রান্সও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি ফি নেয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ফি কাঠামো প্রথম চালু হয়েছিল ২০১৯ সালে। তবে এতদিন বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বাড়তি ফি কার্যকর করেনি। বিভিন্ন ছাড় ও অব্যাহতির মাধ্যমে তারা পুরনো কম ফি বহাল রেখেছিল। ফলে সরকারের যুক্তি হলো, বর্তমানে ফরাসি করদাতাদের অর্থে বিদেশী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। নতুন নীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব হবে। একই সাথে সরকার বলছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘উচ্চ সম্ভাবনাময়’ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা যাবে। এর বিনিময়ে বিদেশী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ এবং ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই নীতির ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু শিক্ষার্থী ফ্রান্সে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে ফরাসিভাষী আফ্রিকান দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন নীতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত ১২ মে পথ্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রথম দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার কথা বলছে, অন্য দিকে অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে বাস্তবে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনের জোট ২৬ মে আবারো দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তাদের দাবি, সরকারকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।